🔹Adhunik Bangla Sahityer Dhara Question Answer
1. বাংলা কাব্য-কবিতার ধারায় কবিগান ও টপ্পা গানের ইতিহাস পর্যালোচনা করো।
উত্তর : বাংলা কাব্য-সাহিত্যের বিকাশে সংগীতের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গানের ধরন ও রুচিরও পরিবর্তন হয়েছে। এই ধারায় কবিগান ও টপ্পা গান এক সময় বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। নিচে প্রশ্নের আলোকে তাদের ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
কবিগানের ইতিহাস : অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে উনবিংশ শতকের শেষ পর্যন্ত কলকাতার হঠাৎ ধনী হয়ে ওঠা কিছু সাধারণ মানুষের পৃষ্ঠপোষকতায় কবিগানের শুরু হয়। মূলত তৎকালীন সমাজে তাৎক্ষণিক আনন্দ ও উত্তেজনা দেওয়ার জন্যই এই গানের জন্ম হয়েছিল। স্বভাবতই কবিতা রচনায় দক্ষ কিন্তু অল্পশিক্ষিত গায়করা কবিয়াল নামে পরিচিত ছিলেন। দুজন কবিয়াল একটি বিষয় নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পদ রচনা করে প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে একে অপরকে হারানোর চেষ্টা করতেন। ঢোল ও করতালের সঙ্গে দল নিয়ে গান পরিবেশন করা হতো। কবিগানের আসরে নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল। প্রথমে ভবানী বিষয়ক গান, তারপর সখী সংবাদ ও বিরহের অংশ গাওয়া হতো। সবশেষে খেউড় বা লহর পরিবেশন করা ছিল প্রচলিত প্রথা। গোঁজলা গুঁই, হরু ঠাকুর, নিতাই বৈরাগী, ভোলা ময়রা, রাম বসু, কেষ্টা মুচি ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি প্রমুখ ছিলেন এই ধারার উল্লেখযোগ্য কবিয়াল।
টপ্পা গানের ইতিহাস : টপ্পা গানের বিকাশে রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবুর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। ‘টপ্পা’ শব্দের অর্থ ‘লাফ’, যা এর সুরের দ্রুত ওঠানামার বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশ করে। সংক্ষেপে বলা যায়, ধ্রুপদ বা খেয়ালের তুলনায় হালকা ও সংক্ষিপ্ত ধাঁচের গানই টপ্পা।
নিধুবাবু কর্মসূত্রে বিহারের ছাপরা অঞ্চলে অবস্থানকালে হিন্দুস্থানি সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে বাংলায় টপ্পা গানের সূচনা করেন। তাঁর পর শ্রীধর কথক, কালী মির্জা ও রূপচাঁদ পক্ষী প্রমুখ শিল্পী এই ধারাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
উপসংহার : সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচি ও সাহিত্যরূপ বদলেছে, তাই কবিগান আজ ইতিহাসের অংশ। তবুও এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘কবি’ উপন্যাসে কবিগানের কথা তুলে ধরেছেন। তাই কবিগান ও টপ্পা উভয়ই বাংলা কাব্য-সংগীতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।
2. যুগসন্ধিক্ষণের কবি' কাকে বলা হয় ও কেন ? বাংলা কাব্যসাহিত্যে তাঁর অবদান আলোচনা করো। ৫
অথবা, ঈশ্বর গুপ্তের কবিপ্রতিভা আলোচনা করো। ২+৩
অথবা, যুগসন্ধি কবি হিসেবে ঈশ্বর গুপ্তের কবিপ্রতিভার আলোচনা করো। ৫
উত্তর : বাংলা কাব্যসাহিত্যে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের সময়ে যাঁর আবির্ভাব, তিনি হলেন ঈশ্বর গুপ্ত। এই সময়টি ছিল পরিবর্তনের কাল। তাই তাঁকে ‘যুগসন্ধিক্ষণের কবি’ বলা হয়।
যুগসন্ধিক্ষণের কবি বলার কারণ : ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের মৃত্যুর পর মধ্যযুগের সাহিত্যধারা শেষ হতে থাকে। ১৮১২ সালে ঈশ্বর গুপ্তের জন্ম, যখন পুরনো ও নতুন যুগের মিলনকাল। তিনি দেবদেবীর কাহিনি নির্ভর রচনা থেকে সরে এসে ছোটো ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁর কাব্যে একদিকে মধ্যযুগের ধারা, অন্যদিকে আধুনিকতার সূচনা এই দুই বৈশিষ্ট্যের মিল দেখা যায়। তাই তিনি যুগসন্ধিক্ষণের কবি নামে পরিচিত।
ঈশ্বর গুপ্তের কবিপ্রতিভা :
(ক) স্বদেশপ্রেম ও দেশচেতনা : তাঁর কবিতায় দেশপ্রেম স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। জননী ভারতভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁর রচনায় প্রকাশ পেয়েছে।
(খ) সমকালীন সমাজচিত্র : তিনি পুরাণকাহিনি বাদ দিয়ে তৎকালীন সমাজজীবনের নানা দিক কবিতায় তুলে ধরেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সংঘাত তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে।
(গ) নারী ও সামাজিক প্রসঙ্গ : নারীর স্বাধীনতা, ইংরেজি শিক্ষা, বিধবাবিবাহ প্রভৃতি বিষয়ে তিনি সমালোচনামূলক মত প্রকাশ করেছেন। সমসাময়িক সামাজিক পরিবর্তনের প্রতি তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।
(ঘ) সাধারণ বিষয়কে কবিতায় স্থান : দৈনন্দিন জীবনের ছোটোখাটো বস্তু যেমন আনারস, নারকেল, পিঠেপুলি, তপসে মাছ ইত্যাদিকেও তিনি কবিতার বিষয় করেছেন। এতে তাঁর নতুন চিন্তার পরিচয় মেলে।
(ঙ) রচনাশৈলীর বৈশিষ্ট্য : তিনি গীতিকবির চেয়ে খণ্ডকবিতায় বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন। আদর্শবাদী ভাব থাকলেও অতিরিক্ত আবেগ দেখা যায় না। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কবিতাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
উপসংহার : অতএব, ঈশ্বর গুপ্ত বাংলা সাহিত্যের পরিবর্তনকালের কবি। তাঁর রচনায় পুরাতন ও নতুন যুগের মিলন ঘটেছে। তাই তিনি শুধু যুগসন্ধিক্ষণের কবি নন, বাংলা কাব্যসাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন রচয়িতা হিসেবেও স্মরণীয়।
3. আধুনিক বাংলা কাব্যে মধুসূদন দত্তের অবদান আলোচনা করো। ৫
অথবা, 'মেঘনাদবাধ কাব্য কার লেখা? তাঁর কাব্যপ্রতিভা আলোচনা করো। [WBCHSE Sample Question] ২+৩
অথবা, মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবি হিসেবে তাঁর বিশিষ্টতা নির্দেশ করো। ৫
উত্তর : বাংলা কাব্যসাহিত্যের নবযুগের সূচনায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি কেবল নতুন কাব্যরীতি প্রবর্তনই করেননি, বরং ভাব, ভাষা ও ছন্দে মৌলিক পরিবর্তন এনে বাংলা কবিতাকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে দেন। তাঁর আবির্ভাবের মাধ্যমে বাংলা কাব্যে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে।
বাংলা কাব্যে মধুসূদন দত্তের অবদান :
(ক) অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন : পাশ্চাত্য সাহিত্যের ব্ল্যাংক ভার্স অনুসরণ করে তিনি বাংলায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ চালু করেন। এর ফলে কবিতার ভাবপ্রকাশ বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে গিয়ে আরও স্বাধীন ও স্বাভাবিক হয়। বাংলা ছন্দের বিকাশে এটি ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
(খ) আখ্যানকাব্যে অভিনবত্ব : তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য তাঁর অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত প্রথম কাব্য। এতে কল্পনার বিস্তার, ভাষার শক্তি ও আখ্যানধর্মী উপস্থাপনার নতুন ধারা দেখা যায়। এই কাব্য বাংলা মহাকাব্য রচনার পথ প্রস্তুত করে।
(গ) মহাকাব্যে শ্রেষ্ঠ কীর্তি : মেঘনাদবধ কাব্য তাঁর সর্বাধিক বিখ্যাত রচনা। নয়টি সর্গে বিন্যস্ত এই কাব্যে তিনি প্রচলিত কাহিনিকে নতুন ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দের সফল প্রয়োগ এবং চরিত্রচিত্রণের গভীরতা কাব্যটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
(ঘ) পত্রকাব্যের সৃজনশীল প্রয়োগ : বীরাঙ্গনা কাব্য-এ পৌরাণিক নারীদের কণ্ঠে চিঠির আকারে ভাব প্রকাশ করা হয়েছে। এতে নারীর মনের গোপন অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, যা বাংলা কাব্যে নতুন সংযোজন।
(ঙ) সনেটের প্রচলন : চতুর্দশপদী কবিতাবলী-র মাধ্যমে তিনি সনেট রচনার ধারা চালু করেন। এতে ব্যক্তিগত ভাবনা ও আবেগ সংযত আকারে প্রকাশ পেয়েছে এবং বাংলা গীতিকাব্য সমৃদ্ধ হয়েছে।
উপসংহার : অতএব, মধুসূদন দত্ত বাংলা কাব্যকে প্রাচীন প্রথা থেকে বের করে আধুনিক রূপ দেন। তাঁর কাব্যে নতুন চিন্তা, নতুন ছন্দ ও নতুন ভাষার ব্যবহার বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রকৃত পথিকৃত হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয়।
4. বিহারীলাল চক্রবর্তীকে ‘ভোরের পাখি’ বলা হয় কেন ? তাঁর গীতিকবিতায় অবদান আলোচনা করো। ৫
উত্তর : বাংলা গীতিকবিতার প্রারম্ভিক পর্যায়ে বিহারীলাল চক্রবর্তী এক গুরুত্বপূর্ণ কবি। তাঁর কাব্যে ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম ও প্রকৃতির সুর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই বাংলা কাব্যধারায় তাঁর স্থান বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।
‘ভোরের পাখি’ বলার কারণ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘অবোধবন্ধু’ পত্রিকায় বিহারীলালের কবিতা পড়ে গভীরভাবে মুগ্ধ হন। ভোরের সময় পাখি যেমন নিভৃতে নিজের সুরে গান গায়, তেমনি বিহারীলালও নিজের অনুভূতিকে আপন ছন্দে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কবিতায় ছিল স্বতঃস্ফূর্ত সুর ও আন্তরিকতা। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে “ভোরের পাখি” নামে অভিহিত করেন। অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যের ভোরবেলায় তিনিই প্রথম মধুর গীতধ্বনি তুলেছিলেন।
বাংলা গীতিকবিতায় বিহারীলালের অবদান :
(ক) আধুনিক গীতিকবিতার সূচনা : তাঁকেই আধুনিক বাংলা গীতিকবিতার প্রথম সার্থক কবি বলা হয়। মহাকাব্যের ধারা কমে আসার সময় তিনি ব্যক্তিগত আবেগকে কেন্দ্র করে নতুন কাব্যরীতি গড়ে তোলেন।
(খ) প্রেম ও প্রকৃতির সমন্বয় : তাঁর কাব্যে প্রেম ও নিসর্গ প্রধান বিষয়। ‘সঙ্গীতশতক’, ‘বঙ্গসুন্দরী’, ‘নিসর্গ সন্দর্শন’ প্রভৃতি কাব্যে প্রকৃতি ও হৃদয়ের অনুভূতি একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতির বর্ণনা শুধু বাহ্যিক নয়, তা মানবমনের আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে।
(গ) ব্যক্তিমানসের গভীর অনুভূতি : তাঁর রচনায় ব্যক্তিগত দুঃখ, শোক ও আনন্দ সরল ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। ‘বন্ধুবিয়োগ’ ও ‘প্রেম প্রবাহিনী’ কাব্যে ব্যক্তিগত শোক, প্রেম ও অন্তরঙ্গ অনুভূতি গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। এই আন্তরিকতা গীতিকবিতাকে প্রাণবন্ত করেছে।
(ঘ) কল্পনা ও ভাবব্যঞ্জনার গভীরতা : ‘সারদামঙ্গল’ ও ‘সাধের আসন’-এ তাঁর কাব্যপ্রতিভার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে। কল্পনা, ধ্যানমগ্নতা ও আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ বাংলা গীতিকবিতাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
(ঙ) সহজ ভাষার ব্যবহার : তাঁর ভাষা ছিল কোমল, মাধুর্যমণ্ডিত ও সুরধর্মী। এই গীতিময় ভাষাশৈলী বাংলা গীতিকবিতাকে নতুন স্বাদ ও সৌন্দর্য প্রদান করেছে।
উপসংহার : অতএব, বিহারীলাল চক্রবর্তী বাংলা রোমান্টিক গীতিকবিতার পথপ্রদর্শক। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতির সুর প্রথম স্পষ্টভাবে ধ্বনিত হয়। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে যথার্থই ‘ভোরের পাখি’ বলেছেন। বাংলা গীতিকবিতার বিকাশে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
5. বাংলা কাব্যে জীবনানন্দ দাশের অবদান সম্পর্কে লেখো। ৫
উত্তর : জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র আসন অধিকার করেন। তাঁর কবিতায় নিঃসঙ্গ মনন, গভীর চিত্রকল্প ও নতুন ভাষার ব্যবহার আধুনিক কাব্যকে আলাদা রূপ দেয়। তাই বাংলা কাব্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
বাংলা কাব্যে জীবনানন্দ দাশের অবদান :
(ক) নিজস্ব কাব্যধারার সূচনা : তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ এ তিনি সচেতনভাবে পূর্ববর্তী প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। এই গ্রন্থে তাঁর কাব্যভাষা ও ভাবনার স্বাতন্ত্র্য ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। এখান থেকেই তাঁর নতুন কাব্যপথের শুরু ধরা পড়ে।
(খ) নির্জন প্রকৃতি ও অন্তর্মুখী ভাবনা : তাঁর ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যে কবির একাকী মন এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর টান স্পষ্ট। এখানে প্রকৃতি শুধু বর্ণনার বিষয় নয়, বরং কবির মানসজগতের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। নিসর্গের মধ্যে তিনি নিজের অনুভূতিকে খুঁজে পান।
(গ) সময়চেতনা ও চিরন্তন পথচলার ধারণা : তাঁর ‘বনলতা সেন’ কাব্যে মানুষের দীর্ঘ যাত্রা, অতীত-ভবিষ্যতের সংযোগ এবং বিশ্রামের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। এই গ্রন্থে সময়কে তিনি এক বিস্তৃত বোধের মধ্যে প্রকাশ করেছেন, যা তাঁর কবিতাকে গভীরতা দিয়েছে।
(ঘ) সমাজ, রাষ্ট্র ও যুগসচেতনতা : তাঁর ‘মহাপৃথিবী’ এবং ‘সাতটি তারা তিমির’ কাব্যে ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি যুগের অস্থিরতা, সমাজের সংকট ও রাষ্ট্রের বিপন্নতার চিত্র পাওয়া যায়। এতে বোঝা যায়, তিনি শুধু নিসর্গকবি নন, সমাজসচেতন কবিও ছিলেন।
(ঙ) বঙ্গপ্রকৃতির সৌন্দর্য ও অভিনব ভাষাশৈলী : ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যে বাংলার নদ-নদী, মাঠ, ফুল-পাখির রূপ তিনি গভীর আবেগে ফুটিয়ে তুলেছেন। একই সঙ্গে নতুন উপমা, দেশজ শব্দ এবং প্রয়োজনমতো বিদেশি শব্দের ব্যবহারে তাঁর ভাষা হয়েছে স্বতন্ত্র ও চিত্রময়।
উপসংহার : তিনি বাংলা কবিতায় নতুন ভাবধারা, গভীর সময়চেতনা ও অভিনব চিত্রকল্পের পরিচয় দেন। ব্যক্তিমানস, প্রকৃতি ও সমাজচিন্তার সমন্বয়ে তিনি আধুনিক বাংলা কাব্যকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন। তাই বাংলা কাব্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্থায়ী।
6. বাংলা কবিতায় কাজী নজরুল ইসলামের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করো। ৫
উত্তর : কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতায় তারুণ্য, প্রতিবাদ ও অগ্নিস্বরের এক শক্তিশালী ধারা তৈরি করেন। তাঁর কাব্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ আহ্বান যেমন আছে, তেমনি প্রেম, মানবতা ও সাম্যের বাণীও সমানভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলা কবিতায় কাজী নজরুল ইসলামের অবদান :
(ক) বিদ্রোহী চেতনার প্রকাশ : নজরুল পরাধীনতা ও শোষণের বিরুদ্ধে কবিতায় তীব্র প্রতিবাদ জানান। ‘বিদ্রোহী’, ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘সাম্যবাদী’ কাব্যে অন্যায় শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর দৃপ্ত কণ্ঠ শোনা যায়। এসব রচনায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান স্পষ্ট।
(খ) সমাজসচেতনতা ও সাম্যের বাণী : ‘সর্বহারা’ ও ‘ভাঙ্গার গান’ কাব্যে তিনি শোষিত মানুষের কথা বলেছেন। সমাজে বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। সাম্য ও ন্যায়ের আদর্শ তাঁর কবিতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
(গ) প্রেম ও প্রকৃতির কোমল অনুভূতি : বিদ্রোহী মনোভাবের পাশাপাশি তাঁর কাব্যে প্রেমের সুরও ধ্বনিত হয়েছে। ‘দোলনচাঁপা’ ও ‘ছায়ানট’ কাব্যে প্রেম ও প্রকৃতির সৌন্দর্য কোমল ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে, যা তাঁর কাব্যপ্রতিভার আরেক দিক তুলে ধরে।
(ঘ) শিশুমনের সরলতা ও কল্পনা : শিশুদের জন্য রচিত ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘লিচু চোর’, ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’ প্রভৃতি কবিতায় সরল আনন্দ ও কৌতূহল ধরা পড়ে। এতে বোঝা যায়, তিনি শুধু বিদ্রোহের কবি নন, শিশুতোষ রচনাতেও সমান দক্ষ।
(ঙ) ভাষার বৈচিত্র্য ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাব : তাঁর কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের স্বাভাবিক ব্যবহার দেখা যায়। পাশাপাশি তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার কথা বলেছেন, যা তাঁর কাব্যকে উদার ও সর্বজনীন করেছে।
উপসংহার : অতএব, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতায় প্রতিবাদ, সাম্য ও মানবতার শক্তিশালী ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কাব্যে দেশপ্রেম, বিদ্রোহী চেতনা ও প্রেমের মেলবন্ধন দেখা যায়। তাই তিনি বাংলা সাহিত্যে যথার্থই ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে চিরস্মরণীয়।
7. বাংলা মহাকাব্যের ধারায় হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অবদান আলোচনা করো। ৫
উত্তর : হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা কাব্যসাহিত্যে মধুসূদনের পর মহাকাব্য রচনার ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান। বিশেষ করে তাঁর রচিত ‘বৃত্রসংহার’ কাব্যের জন্য তিনি মহাকাব্যিক মর্যাদা লাভ করেন এবং বাংলা মহাকাব্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকেন।
বাংলা মহাকাব্যের ধারায় হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান :
(ক) মহাকাব্য রচনায় উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব : তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা ‘বৃত্রসংহার’ বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই কাব্যের মাধ্যমেই তিনি মহাকাব্যিক ধারায় নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
(খ) পৌরাণিক কাহিনির কাব্যরূপ প্রদান : ‘বৃত্রসংহার’–এ বৃত্রাসুরের স্বর্গজয়, দেবতাদের বিতাড়ন, দধীচির আত্মত্যাগ এবং ইন্দ্রের হাতে বৃত্রাসুরবধ এই ঘটনাগুলিকে তিনি কাব্যরূপ দিয়েছেন। পৌরাণিক কাহিনিকে মহাকাব্যের আকারে উপস্থাপন করাই তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব।
(গ) মহাকাব্যোচিত গাম্ভীর্য ও বর্ণনাশৈলী : এই কাব্যে চরিত্র নির্মাণ, দৃশ্যচিত্র এবং ভাবের গাম্ভীর্যে মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। ঘটনাপ্রবাহ ও বর্ণনার মধ্যে তিনি বৃহৎ কাব্যের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।
(ঘ) ছন্দ ও অলংকারের দক্ষ ব্যবহার : ‘বৃত্রসংহার’ কাব্যে ছন্দ, অলংকার ও ভাষার ব্যবহার তাঁর কাব্যদক্ষতার পরিচয় দেয়। এর মধ্যে পূর্ববর্তী মহাকাব্যের প্রভাব থাকলেও তিনি নিজস্ব ভঙ্গিতেই তা উপস্থাপন করেছেন।
(ঙ) মহাকাব্য ধারার উত্তরাধিকার রক্ষা : মধুসূদনের পর বাংলা মহাকাব্য রচনার যে ধারা তৈরি হয়েছিল, হেমচন্দ্র তা বজায় রাখেন। অনেকের মতে, ‘বৃত্রসংহার’ বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় মহাকাব্যের মর্যাদা লাভ করে, যা তাঁর কৃতিত্বকে আরও উজ্জ্বল করেছে।
উপসংহার : অতএব, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বৃত্রসংহার’ কাব্যের মাধ্যমে বাংলা মহাকাব্যের ধারাকে সমৃদ্ধ করেন। এই রচনার জন্যই তিনি বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যিক মর্যাদায় স্মরণীয় হয়ে আছেন।
🔹লেখকের শেষ মন্তব্য : আমাদের প্রকাশিত একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা সাজেশন ই-বুকটিতে(PDF) বোর্ডের নতুন সিলেবাস ও নতুন প্রশ্নপত্রের নিয়ম মেনে প্রতিটি অধ্যায় থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর খুব সহজ ও পরিষ্কারভাবে সাজানো হয়েছে। তাই এই ই-বুক(PDF)টি কিনতে হলে মেনু অপশনে ক্লিক করে বিস্তারিত জানতে পারবেন এবং প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
File Details :
PDF Name : আধুনিক বাংলা সাহিত্য (পর্ব-৩) PDF
Size : 1 MB
No. of Pages : 4
Mode : Read-only (Online)
Download Link : Click here To Download PDF
| আরো পড়ুন | প্রশ্নোত্তর |
|---|---|
| 1. আধুনিক বাংলা সাহিত্য (পর্ব-১) PDF | Click here |
| 2. আজব শহর কলকেতা প্রশ্ন উত্তর PDF | Click here |
| 3. নুন কবিতার প্রশ্ন উত্তর PDF | Click here |
| 4. আগুন নাটকের প্রশ্ন উত্তর PDF | Click here |
Regards,
WB Semester Team
Registered under MSME (Udyam), Govt. of India
All Legal Rights Reserved
Call & WhatsApp : 9883566115
