🔹 আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা Class 11 Question Answer
1. বেলগাছিয়া নাট্যশালা স্থাপন এবং এই নাট্যালয়ে অভিনীত নাটকগুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো। [WBCHSE Sample Question]
উত্তর : উনিশ শতকের শৌখিন নাট্যচর্চার যুগে বেলগাছিয়া নাট্যশালা একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এটি বাংলা নাট্যজগতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বেলগাছিয়া নাট্যশালা স্থাপন : পাইকপাড়ার রাজা ঈশ্বর সিংহ ও প্রতাপচন্দ্র সিংহ তাঁদের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে এই নাট্যশালা গড়ে তোলেন। বাগানবাড়িটি আগে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখানে রামনারায়ণ তর্করত্ন সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনূদিত ‘রত্নাবলী’ নাটক মঞ্চস্থ করেন। এছাড়া তাঁর মৌলিক রচনা ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ও অভিনীত হয়। ১৮৫৮ সালে এই দুটি নাটক মঞ্চে এলে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা নাটকের মান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
অভিনীত নাটকসমূহ : ‘রত্নাবলী’ ও ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ মঞ্চস্থ হওয়ার পর বাংলা নাটকের মান নিয়ে হতাশ হন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। সেই হতাশা থেকেই তিনি উন্নত রুচিসম্পন্ন নাটক রচনায় আগ্রহী হন। মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে তিনি ১৮৫৯ সালে ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক রচনা করেন। পাশ্চাত্য রীতিতে গঠিত এই নাটকটিকে বাংলা ভাষায় আধুনিক ধাঁচের প্রথম সফল নাটকগুলির একটি হিসেবে ধরা হয়। ১৮৫৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকবার অভিনীত হওয়ায় এর জনপ্রিয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই মঞ্চে কয়েকটি ইংরেজি নাটকের মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা নাট্যচর্চায় নতুন ভাবনার পরিচয় দেয়। দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ও সুরের সংযোজনে সংগীত পরিবেশনেও অভিনবত্ব আনা হয়। তবে প্রধান উদ্যোক্তা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহের অকালমৃত্যুর ফলে নাট্যশালার অগ্রগতি ব্যাহত হয়। তবুও স্বল্প সময়ের মধ্যেই বেলগাছিয়া নাট্যশালা শিক্ষিত বাঙালি ও নাট্যপ্রেমীদের মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে এবং বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে স্থায়ী গুরুত্ব অর্জন করে।
উপসংহার : অতএব স্বল্পকাল স্থায়ী হলেও বেলগাছিয়া নাট্যশালা বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে এবং শিক্ষিত সমাজের মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠে।
2. রামনারায়ণ তর্করত্নের নাট্যকৃতিত্ব আলোচনা করো।
উত্তর : মধুসূদন দত্তের আগে বাংলায় যাঁরা নাট্যরচনায় খ্যাতি অর্জন করেন, তাঁদের মধ্যে রামনারায়ণ তর্করত্ন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত হয়েও তিনি উদার মনোভাবের অধিকারী ছিলেন। সহজ ও রসপূর্ণ লেখনীর জন্য তিনি ‘নাটুকে রামনারায়ণ’ নামে পরিচিতি পান। তিনি বাংলা ভাষার প্রথম দিকের মৌলিক নাট্যকার এবং হরিনাভি বঙ্গনাট্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা।
রামনারায়ণ তর্করত্নের নাট্যকৃতিত্ব :
(ক) সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ : সমাজে বহুবিবাহের অপকারিতা তুলে ধরতে তিনি রচনা করেন ‘কুলীন কুলসর্বস্ব’ (১৮৫৪)। এই নাটকে কুলীন প্রথার অসংগতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
(খ) পৌরাণিক কাহিনির নাট্যরূপ : ধর্মীয় ও পৌরাণিক আখ্যান অবলম্বনে তিনি ‘রুক্মিণীহরণ’, ‘কংসবধ’ ও ‘ধর্মবিজয়’ নাটক রচনা করেন, যেখানে পুরাণকথা নাট্যরূপ লাভ করেছে।
(গ) সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ : সংস্কৃত সাহিত্যকে বাংলায় পরিচিত করতে তিনি ‘বেণীসংহার’, ‘রত্নাবলী’, ‘অভিজ্ঞান শকুন্তল’ ও ‘মালতীমাধব’ অনুবাদ করেন। এর ফলে বাংলা নাট্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়।
(ঘ) প্রহসন রচনায় সাফল্য : ব্যঙ্গ ও রসের মিশ্রণে তিনি ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’ প্রহসন লেখেন। সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরতে ‘চক্ষুদান’ ও সতীন সমস্যাকে কেন্দ্র করে ‘উভয়সংকট’ রচনা করেন।
(ঙ) নাট্যমঞ্চে প্রভাব : তাঁর বহু নাটক বেলগাছিয়া ও জোড়াসাঁকোর নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয়ে জনপ্রিয়তা পায়, যেমন ‘রত্নাবলী’।
উপসংহার : সুতরাং রামনারায়ণ তর্করত্ন প্রাক-মধুসূদন যুগে বাংলা নাট্যসাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মৌলিক ও অনূদিত রচনাই পরবর্তী আধুনিক নাট্যধারার পথ প্রস্তুত করে।
3. বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে মধুসূদন দত্তের কৃতিত্ব আলোচনা করো।
অথবা, মাইকেল মধুসূদন দত্তের দুটি নাটকের নাম লেখো ? নাট্যকার হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব আলোচনা করো। [WBCHSE (XI) 17]
উত্তর : উনিশ শতকের বাংলা নাট্যসাহিত্য তখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। এই অবস্থায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত সাহসের সঙ্গে নতুন পথ দেখান। তিনি প্রচলিত ধারা ভেঙে আধুনিক রীতিতে বাংলা নাটক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ফলে বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা হয়।
বাংলা নাট্যসাহিত্যে মধুসূদন দত্তের কৃতিত্ব :
(ক) পাশ্চাত্য রীতির প্রবর্তন : তিনি ‘শর্মিষ্ঠা’ (১৮৫৯) নাটকে মহাভারতের কাহিনি ব্যবহার করলেও তিনি ইউরোপীয় নাট্যগঠন অনুসরণ করেন। এর মাধ্যমে বাংলা নাটক নতুন কাঠামো ও নাটকীয়তা লাভ করে।
(খ) অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগ : ‘পদ্মাবতী’ (১৮৬০) নাটকে প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করে ভাষাকে গম্ভীর ও শক্তিশালী করে তোলেন। এতে নাটকের ভাব প্রকাশ আরও গভীর হয়।
(গ) ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির সূচনা : তিনি ‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬১) নাটকে ইতিহাসভিত্তিক করুণ কাহিনি উপস্থাপন করে বাংলা সাহিত্যে প্রথম ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
(ঘ) রূপকধর্মী চিন্তার প্রকাশ : তিনি ‘মায়াকানন’ (১৮৭৩) নাটকে কল্পনা ও রূপকের মাধ্যমে ভিন্নধর্মী ভাবনার পরিচয় দেন, যদিও এটি অসমাপ্ত রয়ে যায়।
(ঙ) প্রহসনে সমাজসমালোচনা : তিনি ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনে সমকালীন সমাজের ভণ্ডামি ও অন্ধ পাশ্চাত্য অনুকরণকে ব্যঙ্গ করেন। এতে নাটকে হাস্যরসের পাশাপাশি তীক্ষ্ণ সমালোচনাও প্রকাশ পায়।
উপসংহার : অতএব বলতে পারি, মধুসূদন দত্ত বাংলা নাটকে স্বদেশি বিষয় ও পাশ্চাত্য কৌশলের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুন দিশা দেখান। তাঁর সৃষ্ট নাটকগুলি বাংলা নাট্যসাহিত্যকে আধুনিক ও শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে। তাই নাট্যকার হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
4. নীলদর্পণ নাটকের নাট্যকার ও ইংরেজি অনুবাদকের নাম লেখো ? নাটকটির প্রভাব উল্লেখ করো। [WBCHSE (XI) '20] ২+৩
উত্তর : উনিশ শতকের বাংলায় নীলচাষকে ঘিরে যে শোষণ ও অত্যাচার চলছিল, তা সাহিত্যে শক্তভাবে তুলে ধরেন দীনবন্ধু মিত্র। তাঁর রচিত ‘নীলদর্পণ’ নাটক কেবল সাহিত্যকর্ম নয়, সমকালীন সমাজের এক জীবন্ত দলিল হিসেবেও পরিচিত।
নাট্যকার ও ইংরেজি অনুবাদক : ‘নীলদর্পণ’ নাটকের রচয়িতা হলেন দীনবন্ধু মিত্র। এই নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন শিক্ষাবিদ ও প্রাচ্যবিদ জেমস লঙ। তিনি ‘By a Native’ নামে ভূমিকা যুক্ত করে অনুবাদ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে অনুবাদকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও জেমস লঙ-ই অনুবাদক হিসেবে পরিচিত হন।
নীলদর্পণ নাটকটির প্রভাব :
(ক) নীলকরদের অত্যাচার প্রকাশ : ‘নীলদর্পণ’-এ তোরাপ, রাইচরণ প্রভৃতি চরিত্রের মাধ্যমে নীলকর সাহেবদের নির্দয় আচরণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। এতে বাস্তব অবস্থা মানুষের সামনে আসে।
(খ) সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি : পদী ময়রানী ও আদুরির মতো চরিত্রের দুর্দশা পাঠকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং চাষিদের অবস্থার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ায়।
(গ) প্রতিবাদী মনোভাব জাগ্রত করা : নাটকটির বক্তব্য মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উৎসাহিত করে; ফলে নীলকরদের বিরুদ্ধে বিরোধের মনোভাব দৃঢ় হয়।
(ঘ) ব্রিটিশ শাসকদের উদ্বেগ সৃষ্টি : ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের পর শাসকগোষ্ঠী অস্বস্তিতে পড়ে এবং মানহানির মামলায় জেমস লঙ দণ্ডিত হন। এতে নাটকটির আলোড়ন স্পষ্ট হয়।
উপসংহার : অতএব ‘নীলদর্পণ’ শুধু একটি নাটক নয়, বরং সময়ের অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত সাহসী কণ্ঠস্বর। নীলচাষিদের দুর্দশা ও শোষণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে দীনবন্ধু মিত্র সমাজকে নাড়া দিয়েছিলেন। এই নাটক মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও প্রতিবাদের মনোভাব জাগিয়ে তোলে এবং বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক ঐতিহাসিক স্থান অধিকার করে। তাই এর সাহিত্যিক ও সামাজিক গুরুত্ব সমানভাবে স্বীকৃত।
5. গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাট্যকৃতিত্ব আলোচনা করো। [WBCHSE Sample Question]
উত্তর : উনিশ শতকের শেষভাগের বাংলা রঙ্গমঞ্চে যিনি নাট্যকার, অভিনেতা, নির্দেশক ও সংগঠক সব রূপেই বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তিনি হলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তিনি বিপুল সংখ্যক নাটক রচনা করে বাংলা নাট্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন এবং মঞ্চনাটকের জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাট্যকৃতিত্ব :
(ক) গীতিনাট্য রচনা : তাঁর নাট্যজীবনের শুরু গীতিনাট্যের মাধ্যমে। ‘আগমনী’ ও ‘অকালবোধন’ তাঁর প্রথম দিকের গীতিনাট্য। পরে ‘দোললীলা’, ‘মায়াতরু’ ও ‘মোহিনী প্রতিমা’ রচনা করেন। যদিও নাট্যগুণের অভাবে এগুলি বিশেষ জনপ্রিয় হয়নি।
(খ) পৌরাণিক নাটকে সাফল্য : পুরাণকাহিনি অবলম্বনে লেখা ‘অভিমন্যুবধ’, ‘রাবণবধ’, ‘রামের বনবাস’, ‘সীতাহরণ’, ‘পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস’ প্রভৃতি নাটকে তিনি ধর্মীয় আবহ ও নাটকীয়তা এনেছেন। এর মধ্যে ‘জনা’ তাঁর শ্রেষ্ঠ পৌরাণিক নাটক হিসেবে পরিচিত।
(গ) ভক্তিরসাত্মক নাটক : ‘চৈতন্যলীলা’ ও ‘বিল্বমঙ্গল’ নাটকে ভক্তিরসের গভীর প্রকাশ দেখা যায়, যা দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
(ঘ) ঐতিহাসিক নাটকে স্বদেশচেতনা : তাঁর ‘সিরাজদ্দৌল্লা’, ‘মীরকাশিম’, ‘ছত্রপতি শিবাজী’ ও ‘অশোক’ নাটকে দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক সচেতনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
(ঙ) সামাজিক ও প্রহসনমূলক নাটক : পারিবারিক জীবনের সংকট নিয়ে রচিত ‘প্রফুল্ল’ তাঁর শ্রেষ্ঠ সামাজিক নাটক। এছাড়া ‘বলিদান’, ‘হারানিধি’ প্রভৃতিতে সমকালীন সমাজের ছবি ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে ‘সপ্তমীতে বিসর্জন’, ‘সভ্যতার পান্ডা’ প্রভৃতি প্রহসনগুলিতে ব্যঙ্গ থাকলেও কোথাও কোথাও রুচিহীনতার অভিযোগ উঠেছে।
উপসংহার : অতএব, গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাট্যকৃতিত্বের মূল শক্তি তাঁর বৈচিত্র্যে। পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ও প্রহসন সব ধরনের নাটকে তিনি কাজ করেছেন। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও বাংলা রঙ্গমঞ্চকে জনপ্রিয় ও জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
6. দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাট্যকৃতিত্ব আলোচনা করো। [WBCHSE Sample Question]
উত্তর : রবীন্দ্রনাথের সমকালীন নাট্যকারদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি শেকসপিয়রীয় নাট্যরীতি অনুসরণ করে বাংলা নাটককে নতুন মর্যাদা দেন। বিষয়বৈচিত্র্য ও নাট্যগঠনের দৃঢ়তার জন্য তিনি স্বতন্ত্র আসন অধিকার করেন।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাট্যকৃতিত্ব :
(ক) প্রহসন রচনায় দক্ষতা : নাট্যজীবনের শুরুতে তিনি ‘কল্কি অবতার’, ‘বিরহ’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘পুনর্জন্ম’ প্রভৃতি প্রহসন লেখেন। তবে ‘আনন্দ-বিদায়’ প্রহসনটি সমালোচনার কারণে আলোচিত হয়। এসব রচনায় ব্যঙ্গ ও কৌতুকের মাধ্যমে সমকালীন ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে।
(খ) পৌরাণিক নাটকে বিদেশি প্রভাব : দর্শকের আগ্রহ অনুযায়ী তিনি ‘সীতা’ (১৯০৮) ও ‘ভীষ্ম’ (১৯১৪) রচনা করেন। এই নাটকগুলিতে পাশ্চাত্য নাট্যরীতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
(গ) পারিবারিক নাটকে জনপ্রিয়তা : ‘পরপারে’ ও ‘বঙ্গনারী’ নাটকে পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক আবহ তুলে ধরে তিনি সমকালীন দর্শকের সমর্থন লাভ করেন।
(ঘ) ঐতিহাসিক নাটকে বিশেষ কৃতিত্ব : তাঁর প্রধান সাফল্য ঐতিহাসিক নাটকে। ‘প্রতাপসিংহ’, ‘দুর্গাদাস’, ‘নূরজাহান’, ‘মেবার-পতন’, ‘সাজাহান’ প্রভৃতি নাটকে ইতিহাসকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করেছেন।
(ঙ) শেকসপিয়রীয় ট্র্যাজেডির অনুসরণ ও চরিত্রনির্মাণ : ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘সিংহল বিজয়’, ‘তারাবাঈ’, ‘সোরাব রুস্তম’ প্রভৃতি নাটকে মানসিক দ্বন্দ্ব ও ট্র্যাজিক উপাদান ফুটে উঠেছে, যা তাঁর নাট্যগভীরতার পরিচায়ক।
উপসংহার : অতএব, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কাহিনিকে নাট্যরূপ দিয়ে বাংলা নাট্যসাহিত্যে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করেন। দৃঢ় চরিত্রচিত্রণ ও শেকসপিয়রীয় প্রভাব তাঁর নাটককে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তাই বাংলা নাট্যধারায় তাঁর অবদান স্থায়ীভাবে স্মরণীয়।
7. বাংলা নাটকে দীনবন্ধু মিত্রের অবদান আলোচনা করো।
উত্তর : বাংলা নাট্যসাহিত্যের প্রারম্ভিক যুগে যে কয়েকজন নাট্যকার স্বতন্ত্র প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে দীনবন্ধু মিত্র অন্যতম। অল্প সময়ের সাহিত্যজীবন হলেও তিনি বাস্তব জীবনকে নাটকে রূপ দিয়ে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।
বাংলা নাটকে দীনবন্ধু মিত্রের অবদান :
(ক) স্বদেশপ্রেম ও প্রতিবাদী চেতনা : ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) নাটকে নীলচাষিদের উপর নীলকরদের অত্যাচারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। এই নাটক সমাজে আলোড়ন তোলে এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করে।
(খ) প্রহসনে সামাজিক ব্যঙ্গ : ‘সধবার একাদশী’, ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’ (১৮৬৬) ও ‘জামাই বারিক’ (১৮৭২) প্রহসনে তিনি তৎকালীন সমাজের কুপ্রথা ও ভণ্ডামিকে কৌতুকের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। যেমন, ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’-তে এক বৃদ্ধের বিয়েবাতিককে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গচিত্র আঁকা হয়েছে।
(গ) রোমান্টিক নাট্যরচনা : ‘নবীন তপস্বিনী’ ও ‘কমলে কামিনী’ নাটকে প্রেমকাহিনি উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা যায়। যদিও এখানে পার্শ্বচরিত্রের উপস্থিতি বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
(ঘ) বাস্তবধর্মী চরিত্রচিত্রণ : তাঁর নাটকে কথ্যভাষার ব্যবহার ও স্বাভাবিক সংলাপ চরিত্রকে জীবন্ত করেছে। ‘নীলদর্পণ’-এর তোরাপ প্রভৃতি চরিত্র তার উদাহরণ।
(ঙ) সমাজসচেতন নাট্যভাবনা : তাঁর অধিকাংশ নাটকে সমকালীন সমাজের সমস্যা প্রতিফলিত হয়েছে। তবে ‘সধবার একাদশী’ বা ‘জামাই বারিক’-এ যুগজীবনের অসংগতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
উপসংহার : অতএব বলতে পারি, দীনবন্ধু মিত্র বাংলা নাটকে বাস্তবতা ও সমাজসচেতনতার ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাটক ও প্রহসন শুধু সাহিত্যগুণে নয়, সামাজিক গুরুত্বের দিক থেকেও মূল্যবান। তাই বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
🔹লেখকের শেষ মন্তব্য : আমাদের প্রকাশিত একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা সাজেশন ই-বুকটিতে(PDF) বোর্ডের নতুন সিলেবাস ও নতুন প্রশ্নপত্রের নিয়ম মেনে প্রতিটি অধ্যায় থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর খুব সহজ ও পরিষ্কারভাবে সাজানো হয়েছে। তাই এই ই-বুক(PDF)টি কিনতে হলে মেনু অপশনে ক্লিক করে বিস্তারিত জানতে পারবেন এবং প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
File Details :
PDF Name : আধুনিক বাংলা সাহিত্য (পর্ব-৪) PDF
Size : 1 MB
No. of Pages : 4
Mode : Read-only (Online)
Download Link : Click here To Download PDF
| আরো পড়ুন | প্রশ্নোত্তর |
|---|---|
| 1. আধুনিক বাংলা সাহিত্য (পর্ব-১) PDF | Click here |
| 2. আধুনিক বাংলা সাহিত্য (পর্ব-২) PDF | Click here |
| 3. নুন কবিতার প্রশ্ন উত্তর PDF | Click here |
| 4. আগুন নাটকের প্রশ্ন উত্তর PDF | Click here |
Regards,
WB Semester Team
Registered under MSME (Udyam), Govt. of India
All Legal Rights Reserved
Call & WhatsApp : 9883566115
