🔹 Class 12 Bangla Bhasha Probondho
🔹 লেখক-পরিচিতি : স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) : স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতার সিমলা পল্লির দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বিশ্বনাথ দত্ত এবং মাতার নাম ভুবনেশ্বরী দেবী। ছোটবেলায় তিনি বীরেশ্বর বা বিলে নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর আসল নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি স্বামী বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন। তিনি মেট্রোপলিটন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং পরে জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে ১৮৮৪ সালে বিএ পাস করেন। পিতার মৃত্যুর পর আর্থিক সমস্যার কারণে তাঁর আইন পড়া বন্ধ হয়ে যায়। এফ এ পড়ার সময় তাঁর সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের পরিচয় হয় এবং তিনি তাঁর শিষ্য হন। ১৮৮৭ সালে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। আর ১৮৯০ সালে পরিব্রাজক সন্ন্যাসী হিসেবে ভারত ভ্রমণে বের হন এবং ১৮৯৩ সালে শিকাগো ধর্মসভায় বক্তৃতা দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি বরানগরে রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে রামকৃষ্ণ মিশন ও বেলুড় মঠ গড়ে তোলেন। মানুষের সেবাকেই তিনি ধর্মের প্রধান আদর্শ হিসেবে প্রচার করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ভাববার কথা, পরিব্রাজক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, বর্তমান ভারত, কর্মযোগ, রাজযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ। অবশেষে ১৯০২ সালের ৪ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়।
🔹‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের উৎস : ১৯০০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা থেকে স্বামী বিবেকানন্দ ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার সম্পাদককে একটি চিঠি লিখেছিলেন। আলোচ্য প্রবন্ধটি সেই চিঠির একটি অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। পরে ‘উদ্বোধন’ থেকে প্রকাশিত ‘স্বামী বিবেকানন্দ রচনাবলী’-র ষষ্ঠ খণ্ডের ‘ভাববার কথা’-র পঞ্চম অধ্যায়ে ‘বাঙ্গালা ভাষা’ শিরোনামে এই প্রবন্ধটি সংকলিত হয়েছে।
🔹 ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু :
"আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকে সংস্কৃতয় সমস্ত বিদ্যা থাকার দরুন, বিদ্বান এবং সাধারণের মধ্যে একটি অপার সমুদ্র দাঁড়িয়ে গেছে। বুদ্ধ থেকে চৈতন্য রামকৃষ্ণ পর্যন্ত ............... সে ভাষা কি দর্শন-বিজ্ঞান লেখবার ভাষা নয়? যদি না হয় তো নিজের মনে এবং পাঁচজনে ও-সকল তত্ত্ববিচার কেমন করে কর ?
এই অংশের সহজ ব্যাখ্যা : ভারতে অনেক দিন ধরে জ্ঞান ও শিক্ষার প্রধান ভাষা ছিল সংস্কৃত। তাই যারা সংস্কৃত জানত তারা বিদ্বান হিসেবে পরিচিত ছিল, আর সাধারণ মানুষ সেই ভাষা না জানার কারণে তাদের সঙ্গে একটা বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ফলে শিক্ষিত মানুষ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য এবং রামকৃষ্ণের মতো মহাপুরুষরা মানুষের কল্যাণের কথা বলার সময় কঠিন ভাষা ব্যবহার করেননি। তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সহজ ও চলতি ভাষাই ব্যবহার করেছিলেন। এর ফলে সাধারণ মানুষও তাঁদের কথা বুঝতে পেরেছিল। এই প্রসঙ্গে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন যদি এই মহান ব্যক্তিরা জীবনের গভীর ভাবনা ও শিক্ষা সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন, তবে আমরা কেন বিদ্যা, দর্শন বা বিজ্ঞান সহজ ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। লেখকের মতে, জ্ঞান তখনই সবার কাছে পৌঁছায় যখন তা সহজ ও স্বাভাবিক ভাষায় বলা বা লেখা হয়। এমন ভাষা ব্যবহার করা উচিত যাতে সাধারণ মানুষও তা বুঝতে পারে। নইলে কঠিন ভাষায় লেখা বই কেবল পাণ্ডিত্য দেখানোর জন্যই থেকে যায়, মানুষের উপকারে তেমন আসে না।
" স্বাভাবিক যে ভাষায় মনের ভাব আমরা প্রকাশ করি, যে ভাষায় ক্রোধ দুঃখ ভালবাসা ইত্যাদি জানাই, তার চেয়ে উপযুক্ত ভাষা হতে পারেই না; ............. আমাদের ভাষা্য- সংস্কৃতর গদাই লস্করি চাল - ঐ এক-চাল নকল করে অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। ভাষা হচ্ছে উন্নতির প্রধান উপায়, - লক্ষণ।"
এই অংশের সহজ ব্যাখ্যা : মানুষ সাধারণত যে ভাষায় নিজের মনের কথা প্রকাশ করে, সেই ভাষাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ও উপযুক্ত। রাগ, দুঃখ, আনন্দ বা ভালোবাসার মতো অনুভূতি মানুষ সাধারণত চলতি কথার ভাষাতেই প্রকাশ করে। তাই মানুষের ভাব প্রকাশের জন্য সহজ ও স্বাভাবিক ভাষাই সবচেয়ে ভালো। কিন্তু অনেক সময় লেখার ক্ষেত্রে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয় যা খুব কঠিন ও অস্বাভাবিক। বিশেষ করে সংস্কৃত ধাঁচের গম্ভীর গদ্যের অনুকরণ করলে ভাষা ভারী ও জটিল হয়ে যায়। এর ফলে ভাষার স্বাভাবিক চলন ও সহজতা নষ্ট হয়। স্বামী বিবেকানন্দের মতে ভাষা এমন হওয়া উচিত যা সহজে ব্যবহার করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে পারে। অর্থাৎ ভাষার মধ্যে গতি ও নমনীয়তা থাকা দরকার। কিন্তু যখন ভাষা অতিরিক্ত জটিল হয়ে পড়ে, তখন সেই স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায়। এই কারণেই তিনি মনে করেন, ভাষা মানুষের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ও চিহ্ন। তাই ভাষাকে সহজ, স্বাভাবিক এবং প্রাণবন্ত রাখা প্রয়োজন, যাতে তা সবার কাছে সহজে পৌঁছাতে পারে।
" যদি বল-ও কথা বেশ; তবে বাঙ্গালা দেশের স্থানে স্থানে রকমারি ভাষা ............. সে কথা হচ্ছে না - কোন ভাষা জিতছে সেইটি দেখ। "
এই অংশের সহজ ব্যাখ্যা : বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের ভাষার চিহ্ন দেখা যায়। এই সব ভাষার মধ্য থেকেই ধীরে ধীরে কলকাতার ভাষা বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। পূর্ব বা পশ্চিম যে দিক থেকেই মানুষ আসুক না কেন, কলকাতায় বসবাস করতে করতে তারা এই ভাষায় কথা বলতে শিখে যায়। এর ফলে এই ভাষার শক্তি আরও বাড়ে। এখানে প্রকৃতিই যেন পথ দেখায়। এর ফলে পূর্ব ও পশ্চিমের যে ভাষাগত পার্থক্য আছে, তা ধীরে ধীরে কমে যায়। বিভিন্ন উপভাষা, দেশি ও বিদেশি ভাষার ধারা যেদিক থেকেই আসুক, সবই এসে কলকাতার ভাষার সঙ্গে মিশে যায়। এইভাবে একটি মিলিত ভাষার রূপ তৈরি হয়। প্রাবন্ধিকের মতে, এই মিলিত ভাষাই পরে চট্টগ্রাম থেকে বৈদ্যনাথ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে প্রচলিত হবে।
" যখন দেখতে পাচ্ছি যে কলকেতার ভাষাই অল্প দিনে সমস্ত বাঙ্গালা দেশের ভাষা হয়ে যাবে ........... হীরেমতির সাজ-পরানো ঘোড়ার উপর বাঁদর বসালে কি ডাল দেখায় ?"
এই অংশের সহজ ব্যাখ্যা : স্বামী বিবেকানন্দ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার ভাষাই ধীরে ধীরে সারা বাংলায় বেশি প্রচলিত হয়ে উঠবে। তাই তিনি মনে করেছিলেন, বইয়ের ভাষা ও মানুষের মুখের ভাষার মধ্যে যদি মিল ঘটাতে হয়, তবে কলকাতার ভাষাকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তিনি আরও বলেন, ভাষাকে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে বেঁধে রাখা ঠিক নয়। ভাষার গায়ে আঞ্চলিকতার ছাপ না রেখে তাকে সবার ব্যবহারের জন্য সহজ ও উন্মুক্ত করে দেওয়া প্রয়োজন। এতে ভাষা মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। বিবেকানন্দের মতে, ভাষার আসল উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভাব প্রকাশ করা। তাই ভাষা যেন স্বাভাবিক ও ভাবের সঙ্গে মানানসই হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, যেমন সুন্দরভাবে সাজানো ঘোড়ার উপর যদি একটি বাঁদর বসানো হয়, তা খুব বেমানান লাগে। ঠিক তেমনি ভাবের সঙ্গে না মিললে ভাষাও অস্বাভাবিক মনে হয়। তাই সহজ, স্বাভাবিক এবং ভাবের উপযোগী ভাষাই সবচেয়ে উপযুক্ত।
" দিকি ব্রাহ্মণের সংস্কৃত দেখ, শবরস্বামীর মীমাংসাভাষ্য দেখ, পতঞ্জলির মহাভাষ্য দেখ, শেষ ............. ঋষিও বুঝতে পারেন না; আবার সে গানের মধ্যে প্যাঁচের কি ধুম।"
এই অংশের সহজ ব্যাখ্যা : প্রাবন্ধিক বিবেকানন্দ সংস্কৃত ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তার সম্পর্কে মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সংস্কৃত খুবই শক্তিশালী ও গম্ভীর ভাষা। কিন্তু অনেক সময় এই ভাষা অতিরিক্ত অলংকার ও ব্যাকরণের ভারে খুব জটিল হয়ে ওঠে। তিনি মজার ভঙ্গিতে বলেন, সংস্কৃত সাহিত্যে অনেক সময় দশ পৃষ্ঠা জুড়ে লম্বা লম্বা বিশেষণ লেখা হয়, আর শেষে হঠাৎ করে ‘রাজা আসীৎ’ (অর্থাৎ রাজা ছিলেন) বলে বাক্য শেষ করা হয়। এতে বোঝা যায় যে মূল কথার চেয়ে সাজসজ্জা অনেক বেশি হয়ে যায়। এই অপ্রয়োজনীয় অলংকারের ভার বোঝাতে স্বামী বিবেকানন্দ কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছেন। যেমন অদ্ভুত কারুকার্য করা থামওয়ালা বাড়ি বা কোনো নারীর খুব বেশি ভারী গয়না পরা এসব যেমন বেশি হলে বেমানান লাগে, তেমনি ভাষাতেও অতিরিক্ত অলংকার থাকলে তা কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক যেন ধ্রুপদি সংগীতের জটিল কালোয়াতি মারপ্যাঁচ, যা হয়তো ভরত ঋষিও সহজে বুঝতে পারবেন না। এই কারণেই সংস্কৃত ভাষা যখন এত বেশি অলংকারে ভরে ওঠে, তখন তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য থাকে না। তাই তাঁর মতে, বাংলা লেখার ভাষারও উচিত সংস্কৃত ভাষার অন্ধ অনুকরণ না করা। বরং সহজ চলিত কথ্য ভাষা ব্যবহার করা উচিত। তাহলেই বাংলা লেখার ভাষা সহজ হবে এবং ভাবের মাধুর্যেই তা সবচেয়ে সুন্দর হয়ে উঠবে।
"যে কি আঁকাবাঁকা ডামাডোল-ছত্রিশ নাড়ীর টান তায় রে বাপ! তার উপর মুসলমান ওস্তাদের নকলে দাঁতে দাত ........... গহনা-পরা মেয়ে-মাত্রই দেবী বলে বোধ হবে, আর বাড়ী ঘর দোর সব প্রাণস্পন্দনেডগমণ করবে।"
এই অংশের সহজ ব্যাখ্যা : প্রাবন্ধিক স্বামী বিবেকানন্দ মুসলমান ওস্তাদের নকল করে গাওয়া সংগীতের উদাহরণ দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তাঁর মতে, শিল্প, সংগীত বা ভাষা যদি ভাবহীন ও প্রাণহীন হয়ে যায়, তবে তার কোনো প্রকৃত মূল্য থাকে না। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, অনেক সময় মানুষ শুধু বাহ্যিক অনুকরণ করে গান গায় বা ভাষা ব্যবহার করে। কিন্তু সেখানে যদি হৃদয়ের ভাব না থাকে, তবে তা মানুষের মনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। অথচ অল্প কয়েকটি সহজ চলিত কথার মধ্যেও গভীর ভাব প্রকাশ করা সম্ভব। সেই ভাব অনেক সময় অসংখ্য কঠিন ও জটিল বিশেষণ ব্যবহার করেও প্রকাশ করা যায় না। এই কারণেই বিবেকানন্দ মনে করেন, ভাষাকে হতে হবে সহজ, সজীব এবং প্রবহমান। ভাষা যখন জীবন্ত ও স্বাভাবিক হয়, তখনই তা মানুষের মনে প্রাণের স্পর্শ আনে এবং জাতির জীবনেও নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এই প্রাণশক্তির প্রভাবে মানুষের মনে ভক্তি ও সৌন্দর্যের অনুভূতি জাগে। তখন মাটির তৈরি দেবতার মূর্তি দেখলেই মানুষের মনে ভক্তিভাব জেগে ওঠে। কোনো অলংকারে সজ্জিত নারীকে দেখলে দেবীর মতো মনে হয়। এমনকি মানুষের ঘরের কোণ থেকে শুরু করে পুরো দেশ স্বাভাবিক আনন্দ ও প্রাণে ভরে ওঠে
🔹 ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের বিষয়বস্তু সংক্ষেপ : ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু বহু প্রাচীনকাল থেকে সংস্কৃত ভাষাতেই অধিকাংশ বিদ্যা প্রচলিত থাকায় বিদ্বান মানুষ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড়ো দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষ সেই জ্ঞান সহজে গ্রহণ করতে পারত না। এই কারণেই গৌতমবুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস যাঁরা মানুষের কল্যাণের কথা বলেছেন, তাঁরা সকলেই মুখের সহজ চলিত ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। তাঁরা সাধারণ মানুষের ভাষায় মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও উপদেশ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমরাও যখন কোনো গভীর বিষয় নিয়ে ভাবি, তখন সাধারণ কথ্য ভাষাতেই চিন্তা করি। কিন্তু সেই কথাগুলো লিখতে গিয়ে অনেক সময় অযথা সংস্কৃতঘেঁষা কঠিন শব্দে ভরা একটি অস্বাভাবিক ভাষা ব্যবহার করি। সংস্কৃত ভাষার গদাই লশকরি ধরণ নকল করতে গিয়ে লেখ্য বাংলা ভাষা অনেক সময় কৃত্রিম হয়ে পড়ে। অথচ স্বাভাবিকতাই ভাষার প্রাণ, আর ভাষা যত সজীব হবে ততই তার উন্নতি হবে। এই প্রসঙ্গেই প্রাবন্ধিক ‘কলকেতার ভাষা’-র কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন উপভাষা থাকলেও কলকাতা শহরে কাজকর্ম ও নানা কারণে অনেক মানুষের সমাগম হয়। তাই ধীরে ধীরে কলকাতার ভাষাই মান্য ভাষা হিসেবে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হলে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার পার্থক্যও কমে যাবে এবং চট্টগ্রাম থেকে বৈদ্যনাথ পর্যন্ত বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে কলকাতার ভাষাই প্রচলিত হবে। যখন এই ভাষা সবার কাছে সহজে বোঝা যাবে, তখন সেটাকেই ভাষার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উপভাষা নিয়ে ঈর্ষা বা বিরোধ করা ঠিক নয়। কারণ ভাষার আসল কাজ হলো ভাব প্রকাশ করা, আর সেই ভাবটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন বাংলা ভাষায় অতিরিক্ত সমাস, বিশেষণ ও নানা ধরনের অলংকার ব্যবহার করা হয়, তখন ভাষার স্বাভাবিক মাধুর্য ও সহজ স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়। তাই প্রাবন্ধিকের মতে, সহজে বোঝা যায় এমন স্বাভাবিক, সাবলীল কথ্য ভাষাই সাহিত্যের ভাষা হওয়া উচিত। ভাষা যখন প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক হয়, তখনই বোঝা যায় সেই ভাষা সত্যিই জীবন্ত ও সজীব।
🔹 ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের শব্দার্থ ও টীকা : চট্টগ্রাম : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এটি বাণিজ্যের জন্য সুপরিচিত / বৈদ্যনাথ : ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে অবস্থিত একটি পবিত্র তীর্থস্থান ও মন্দির / বুদ্ধ : ভগবান বুদ্ধদেবের পূর্বনাম সিদ্ধার্থ গৌতম। তিনি শাক্য বংশের ছিলেন। তাঁর জন্ম নেপালের লুম্বিনী নগরে, আর বড়ো হন কপিলাবস্তুতে। মানুষের দুঃখ দূর করার জন্য তিনি চতুরার্য সত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গের কথা বলেন। তাঁর সময়কাল আনুমানিক ৫৬৩-৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং তিনি কুশীনগরে দেহত্যাগ করেন / চৈতন্য : তিনি ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের প্রবর্তক। তাঁর জন্ম ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে নবদ্বীপে। সন্ন্যাসের আগে তাঁর নাম ছিল নিমাই বা গৌরাঙ্গ। তিনি নামসংকীর্তনের মাধ্যমে প্রেমধর্মের প্রচার করেন এবং ধর্মের সংকীর্ণতা ও বিভাজনের বিরোধিতা করেন / রামকৃষ্ণ : তাঁর পূর্বনাম গদাধর চট্টোপাধ্যায়। জন্ম ১৮৩৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, হুগলির কামারপুকুর গ্রামে। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে তিনি কালীসাধনা করেন। তাঁর স্ত্রী সারদা দেবী ছিলেন সাধনার সহচরী। তাঁর ভাবাদর্শ বিশ্বে প্রচার করেন স্বামী বিবেকানন্দ / ব্রাহ্মণ : ব্রাহ্মণ হল বেদের ভাষ্য। মোট প্রায় ১৯টি ব্রাহ্মণ গ্রন্থের কথা জানা যায় ঋগবেদের ২টি, যজুর্বেদের ৬টি, সামবেদের ১০টি এবং অথর্ববেদের ১টি। বেদ-পরবর্তী কালে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ও ব্যাকরণের বিকাশে এই গ্রন্থগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। উল্লেখযোগ্য ব্রাহ্মণ গ্রন্থের মধ্যে ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ও তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ বিশেষভাবে পরিচিত / শবরস্বামীর ‘মীমাংসাভাষ্য’ : শবরস্বামী আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২য় বা ৩য় শতকে বর্তমান ছিলেন। তিনি পূর্ব মীমাংসা দর্শনের ভাষ্যকার। পরে আচার্য কুমারিল ভট্ট এই শবরভাষ্যের উপর টীকা রচনা করেন / পতঞ্জলির ‘মহাভাষ্য’ : পতঞ্জলি ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন বিখ্যাত দার্শনিক ও ব্যাকরণবিদ। তিনি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ সালের কাছাকাছি সময়ে ছিলেন। তাঁর রচিত ‘মহাভাষ্য’ গ্রন্থে তিনি পাণিনির ব্যাকরণ সূত্রের দার্শনিক ব্যাখ্যা করেছেন। এই গ্রন্থে মোট ৮৫টি আহ্নিক আছে, যা অনেকে এক দিনের পাঠের অংশ বলে মনে করেন। পরে আচার্য ভর্তৃহরি ও আচার্য কৈয়ট এই গ্রন্থের উপর টীকা রচনা করেন / আচার্য শঙ্কর : শঙ্করাচার্য আনুমানিক নবম শতকে বর্তমান ছিলেন। তিনি অদ্বৈতবাদী দর্শনের প্রধান প্রবক্তা। তাঁর মতে, "ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা" এই ধারণাই তাঁর দর্শনের মূল। তিনি দশটি উপনিষদ, গীতা এবং বেদান্তসূত্রের উপর ভাষ্য রচনা করেছিলেন / ব্রাহ্মরাক্ষসী : এটি এক ধরনের ভূত বা পিশাচ। বিশ্বাস করা হয়, কোনো ব্রাহ্মণ যদি নিজের নির্দিষ্ট ধর্মকর্ম যেমন যজন, যাজন, অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা না করেন বা ব্রাহ্মধর্ম থেকে বিচ্যুত হন, তবে মৃত্যুর পরে তিনি ব্রাহ্মরাক্ষস হয়ে যান। বিভিন্ন পুরাণ ও লোককথায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সপ্তম শতকে ময়ূরভট্টের ‘সূর্যশতক’, এছাড়া বেতাল পঞ্চবিংশতি ও পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থেও এর কথা আছে। এখানে শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে / ভরত ঋষি : আচার্য ভরতের আবির্ভাবকাল নিয়ে মতভেদ আছে। তিনি ‘নাট্যশাস্ত্র’ গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে প্রাচীন ভারতীয় নাটক, কাব্যতত্ত্ব ও সংগীতের তাত্ত্বিক আলোচনা করা হয়েছে। এখানে নাটকের বিভিন্ন ধরন, অলংকার, রস ও স্থায়ীভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায় / 'রাজা আসীৎ': রাজা ছিলেন / লোকহিতায় : সাধারণের মঙ্গলের জন্য / দর্শন : জীবন ও জগৎ বিষয়ে গভীর ভাবনা এবং মৌল সতা নিয়ে আলোচনা করা হয় জ্ঞানচর্চার যে শাখায় / অপার : সীমাহীন / গদাইলস্করি চাল : অতি ধীর গতি / কটমট : কঠিন / রকমারি : নানারকম / অপ্রাকৃতিক : অস্বাভাবিক / তয়ের : তৈরি / কিম্ভুতকিমাকার : কুৎসিত বা কদাকার / ভাসান : ভাসিয়ে দেওয়া / শ্লেষ : সাহিত্যের একটি অলংকার। যখন একই শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয় এবং পাঠক সেই একাধিক অর্থ বুঝতে পারেন, তখন তাকে শ্লেষ অলংকার বলা হয় / বাহাদুর সমাস : পান্ডিত্যপূর্ণ সমাস / ভাষ্য : ব্যাখ্যা / অর্বাচীন : আধুনিক / ক্রোধ : রাগ / প্যাঁচওয়া বিশেষণ : জটিল বিশেষণ / উৎকৃষ্ট : শ্রেষ্ঠ / ডামাডোল : হট্টগোল বা বিশৃঙ্খলা / সাফ : স্পষ্ট / শোধরাবার : সংশোধন করার / বলবান : শক্তিশালী / প্রাকৃতিক নিয়ম : প্রকৃতির শৃঙ্খলা বা স্বাভাবিক বিধানের উপর গঠিত নিয়ম / ঈর্ষা : অন্যের উন্নতিতে দুঃখবোধ / ভিত্তিস্বরূপ : কোনোকিছুর মূল।
🔹 ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের প্রশ্ন উত্তর পর্ব : আমি আগেই বলেছি দ্বাদশ শ্রেণীর তৃতীয় সেমিস্টার বাংলা পরীক্ষায় 40 নম্বরের মধ্যে এই প্রবন্ধ থেকে মোট 5 টি MCQ প্রশ্ন আসবে। তাই 5 নম্বর পেতে চাইলে 'বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধটি ভালোভাবে পড়তে হবে। অতএব, 'বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধ থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ MCQ প্রশ্নোত্তর পড়তে চাইলে নিচে দেখুন লিংক দেওয়া আছে। তবে PDF নিতে চাইলে এই ওয়েবসাইটের উপরে Menu Option-এ ক্লিক করে দেখুন।
🔹লেখকের শেষ মন্তব্য : আমাদের প্রকাশিত দ্বাদশ শ্রেণির তৃতীয় সেমিষ্টার সাজেশন ই-বুকটিতে(PDF) বোর্ডের নতুন সিলেবাস ও নতুন প্রশ্নপত্রের নিয়ম মেনে প্রতিটি অধ্যায় থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর সহজ ও পরিষ্কারভাবে সাজানো হয়েছে। তাই দ্বাদশ শ্রেণির তৃতীয় সেমিষ্টার সাজেশন ই-বুক(PDF)গুলি নিতে চাইলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা, আমাদের ওয়েবসাইটের উপরে Menu Option-এ ক্লিক করে বিস্তারিত তথ্য দেখে নিতে পারেন।
File Details :
PDF Name : বাঙ্গালা ভাষা প্রবন্ধের বিষয়বস্তু PDF
Size : 1 MB
No. of Pages : 4
Mode : Read-only (Online)
Download Link : Click here To Download PDF
| আরো পড়ুন | প্রশ্নোত্তর |
|---|---|
| 1. অন্ধকার লেখাগুচ্ছ কবিতার বিষয়বস্তু PDF | Click here |
| 2. দিগ্বিজয়ের রূপকথা কবিতার বিষয়বস্তু PDF | Click here |
| 3. জ্ঞানচক্ষু গল্পের প্রশ্ন উত্তর PDF | Click here |
| 4. আদরিণী গল্পের বিষয়বস্তু PDF | Click here |
Regards,
WB Semester Team
Registered under MSME (Udyam), Govt. of India
All Legal Rights Reserved
Call & WhatsApp : 9883566115
