ভূমিকা : WBCHSE বোর্ডের একাদশ শ্রেণির প্রথম সেমিস্টার বাংলা পরীক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক গল্প ও ভারতীয় কবিতা পড়তে হবে। সেগুলি হলো যথাক্রমে গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখা 'বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো' গল্প এবং ভারভারা রাও এর লেখা 'চারণকবি' কবিতা। তাই তোমাদের সুবিধার জন্য এখন আমি এই ব্লগ পোস্টে ভারভারা রাওয়ের লেখা 'চারণকবি' কবিতাটির কবি-পরিচিতি, উৎস, প্রেক্ষাপট, বিষয়বস্তু, লাইন ধরে ব্যাখ্যা এবং শব্দার্থ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
চারণকবি কবি-পরিচিতি :
কবি ভারভারা রাও ১৯৪০ সালের নভেম্বর মাসে ওয়ারাঙ্গল জেলার চিন্না পেন্ডিয়ালা গ্রামে একটি তেলেগু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরে তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং ১৯৬০ সালে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তেলেগু সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তেলেঙ্গানার দুটি বেসরকারি কলেজে তেলেগু সাহিত্য পড়াতেন। কিছুদিন পরে তিনি ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে প্রকাশনা সহকারী হিসেবে কাজ করার জন্য নয়াদিল্লিতে চলে যান। কিন্তু পরবর্তীতে সেই চাকরি ছেড়ে আবার শিক্ষাক্ষেত্রে ফিরে আসেন। এরপর তিনি ওয়ারাঙ্গলের CKM কলেজে তেলেগু ভাষার প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ধীরে ধীরে তিনি ওই কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পর ১৯৯৮ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি 'সাহিথিমিথরুলু' নামে একটি সাহিত্যিক দল গঠন করেন। তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন ‘চালি নেগাল্লু’ ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয়। পরে তিনি আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘জীবনাহি’ (১৯৭০), ‘ওরেগিম্পু’ (১৯৭৩) এবং ‘স্বেচ্ছা’ (১৯৭৮)। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ভার ভারারাও কবিতাম (১৯৫৭-২০০৭) (ভারভারা রাওয়ের কবিতা) শিরোনামে নির্বাচিত কবিতার একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর কবিতা শুধু তেলেগু ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর অনেক কবিতা ভারতের প্রায় সব ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
চারণকবি কবিতার উৎস :
এই অনুবাদ কবিতাটির মূল রচনা তেলুগু ভাষায় লেখা হয়েছিল। এই কবিতার আসল নাম ছিল ‘কবি’। এটি ১৯৮৫ সালের ২৩ অক্টোবর রচিত হয়। পরে এই কবিতাটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ডি. ভেঙ্কট রাও ‘কবি’ কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ করেন এবং এর নাম দেন ‘দ্য বার্ড’ (The Bard)। এই কবিতার মূল সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল ‘ভবিষ্যৎ চিত্রপট’ (ভবিষ্যথু চিত্রপটম) গ্রন্থে, যা ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করা হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক দেবেশ রায় সম্পাদিত মাসিক ‘সেতুবন্ধন’ পত্রিকার ১৫তম সংখ্যায় ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি শঙ্খ ঘোষ অনূদিত ‘চারণকবি’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল।
চারণকবি কবিতার প্রেক্ষাপট :
দক্ষিণ আফ্রিকার কবি ও বর্ণবিদ্বেষবিরোধী কর্মী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন মোলায়েজকে নিরাপত্তা পুলিশ হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। বর্ণবিদ্বেষী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হওয়ায় ১৯৮৫ সালের ১৮ অক্টোবর প্রিটোরিয়া কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে বন্দি অবস্থায় কবি ভারভারা রাও ১৯৮৫ সালের ২৩ অক্টোবর ‘চারণকবি’ কবিতাটি লেখেন এবং তা মোলায়েজের স্মৃতিতে উৎসর্গ করেন।
চারণকবি কবিতার বিষয়বস্তু :
কবি ভারভারা রাও তাঁর 'চারণকবি' কবিতায় দেখিয়েছেন যে, সমাজে ন্যায়বিচার ও সমতা আনার জন্য যেসব নিয়ম-কানুন তৈরি হয়েছিল, সেগুলি যেন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। শোষিত ও গরিব মানুষদের স্বপ্ন আজ পায়ের তলায় পিষ্ট। তাদের জীবনে একের পর এক বিপদের ঢেউ আছড়ে পড়ে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র জোর করে তাদের গলায় ফাঁস পরিয়ে দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে বাঁচার সব শক্তি। কষ্ট পেতে পেতে তারা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, এখন আর তাদের রক্ত ঝরে না, চোখে জলও আসে না। জীবনের আকাশটা যেন কালো মেঘে ঢেকে গেছে, সেখান থেকে অনবরত বাজ পড়ছে। এমনকি বৃষ্টির জলও তাদের এই সীমাহীন কষ্টকে একটুও কমাতে পারে না।
কিন্তু এত অন্ধকারের মাঝেও একজন কবি জেলের ভেতর বন্দি থেকেই বাইরের স্বাধীনতাকামী মানুষদের জন্য মুক্তির কথা বলে চলেন। রাষ্ট্রের ভয় বা চোখরাঙানিকে পাত্তা না দিয়ে যিনি দিনবদলের সুর বেঁধেছিলেন, সেই রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত তাঁর গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেয়। তবে অবাক করা বিষয় হল, কবির সেই গানই একসময় সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনতার প্রবল প্রতিবাদের সামনে ফাঁসির মঞ্চ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আর যে রাষ্ট্র মানুষকে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল, উল্টে সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের গলাতেই আটকে যায় কাঙ্ক্ষিত সেই ফাঁসির দড়ি।
চারণকবি কবিতার প্রতি লাইনের ব্যাখ্যা :
"নিয়মকানুন যখন সব লোপাট
আর সময়ের ঢেউ-তোলা কালো মেঘের দল
ফাঁস লাগাচ্ছে গলায়
চুঁইয়ে পড়ছে না কোনো রক্ত
কোনো চোখের জলও নয়
ঘূর্ণিপাকে বিদ্যুৎ হয়ে উঠছে বাজ
ঝিরঝিরে বৃষ্টিও হয়ে উঠছে প্রলয়ঝড়, আর,
মায়ের বেদনাশ্রু বুকে নিয়ে
জেলের গরাদ থেকে বেরিয়ে আসছে
কবির কোনো লিপিকার স্বর।"
প্রথম স্তবকের সহজ ব্যাখ্যা : কবির মনে হয়েছে যেন রাষ্ট্রের সব আইন ও নিয়মকানুন একেবারে অকার্যকর হয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী বোথা সরকারের শাসনে প্রতিবাদী কবি ও মুক্তিযোদ্ধা বেঞ্জামিন মোলায়েজের সাহসী কণ্ঠস্বর শাসকদের অত্যাচার ও স্বৈরাচারের আসল রূপ প্রকাশ করে দেয়। এর ফলেই সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। কবিকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয় এবং জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই সরকার এই শাস্তি কার্যকর করতে চায়। তাই কবির মনে হয় যে রাষ্ট্র নিজেই যেন সব নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। মানুষের স্বপ্ন ও আশা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং অত্যাচারের কারণে সাধারণ মানুষ ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়ছে। চারদিকে যেন হতাশা ও অন্ধকারের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মানুষের প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর দমিয়ে দিতে তাদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এত অত্যাচারের পরেও তাদের রক্ত ঝরে না, চোখের জলও যেন শুকিয়ে গেছে। এই অস্থির সময়কে কবি ঝড়, বজ্রপাত ও ঘূর্ণিপাকের চিত্রের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন। মনে হয় যেন গোটা সমাজ অশান্তি ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে কাঁপছে। তবুও এই কঠিন অবস্থাতেও কবির কণ্ঠস্বর থেমে যায়নি। কারাগারের অন্ধকার গরাদের ভেতর থেকেও তিনি সত্য ও প্রতিবাদের কথা উচ্চারণ করে গেছেন। ঠিক যেভাবে মৃত্যুদণ্ডের আগের দিন জেলের ভিতরে বেঞ্জামিনের সঙ্গে তাঁর মা শেষবার দেখা করতে এসেছিলেন। সেই বিদায়ের মুহূর্তে তিনি মায়ের মাধ্যমে মুক্তিকামী বিপ্লবীদের উদ্দেশে একটি বার্তা দিয়ে যান। তাঁর সেই দৃঢ় ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর মানুষের মনে চিরদিন বেঁচে থাকবে এবং অমর হয়ে থাকবে তাঁর লিপিকার স্বর।
"যখন কাঁপন লাগে জিভে
বাতাসকে মুক্ত করে দেয় সুর
গান যখন হয়ে ওঠে যুদ্ধেরই শস্ত্র
কবিকে তখন ভয় পায় ওরা।
কয়েদ করে তাকে, আর
গর্দানে আরো শক্ত করে জড়িয়ে দেয় ফাঁস
কিন্তু, তারই মধ্যে, কবি তাঁর সুর নিয়ে
শ্বাস ফেলছেন জনতার মাঝখানে।"
দ্বিতীয় স্তবকের সহজ ব্যাখ্যা : এই স্তবকে কবি দেখিয়েছেন যে তাঁর একক স্বর গণসুরের আকার নেবে। সেই সুরে কঠিন সময়ের কালো বাতাস পরিষ্কার হবে এবং প্রতিবাদের ভাষা মুক্তি পাবে। যখন রাষ্ট্র এই প্রতিবাদ দমন করতে যুদ্ধের আয়োজন করবে, তখনও কবির সুর জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে এবং গণসংগীতের জন্ম দেবে। আর তখনই রাষ্ট্র কবিকে ভয় দেখাতে এবং তার কণ্ঠ বন্ধ করতে ফাঁস লাগিয়ে দেবে। তবু ফাঁসির দড়ি গলায় বাঁধলেও কবির প্রতিবাদী সুর থেমে যাবে না; বরং তা জনমানুষকে আরও শক্তিশালী করবে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী সরকার মুক্তিকামী ও প্রতিবাদী মোলায়েজের সাহস সহ্য করতে পারেছিল না। বন্দি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোলায়েজের সঙ্গে ভারভারা রাওয়ের চিন্তা ও অবস্থান সবসময় একাত্ম ছিল। কবি জানেন, ব্যক্তিকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি চিরস্থায়ী। প্রতিবাদী কণ্ঠের সুর ফাঁসির মাধ্যমে শেষ হলেও, তাঁর অমর সৃষ্টি সারা পৃথিবীতে তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখে।
"ফাঁসির মঞ্চ
ভারসাম্য রাখবার জন্য
মিলিয়ে যাচ্ছে মাটিতে
স্পর্ধা জানাচ্ছে মৃত্যুকে
আর তুচ্ছ ফাঁসুড়েকে
দিচ্ছে ঝুলিয়ে"
তৃতীয় স্তবকের সহজ ব্যাখ্যা : এই স্তবকে কবি দেখিয়েছেন যে যখন সরকার মানুষকে দমন করে, অত্যাচার চালায় এবং বর্ণবিদ্বেষ করে, তখন জনগণের মুক্ত কণ্ঠ বন্ধ করতে ফাঁসের মতো শক্তি ব্যবহার করে। তখনই কবি তাঁর কলমের মাধ্যমে প্রতিবাদের আগুন জ্বালান। সরকার কবিকে গ্রেফতার ও হত্যা করতে চাইলেও তাঁর জীবন ও সৃষ্টি থেমে যায় না। কবির কবিতা ধ্রুবতারা হয়ে মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত থাকে এবং তাদের বিবেককে উদ্দীপিত করে। শেষে কবি দেখান, একদিন জনগণ তাদের অধিকার ফিরে নেবে। যে সরকার এতদিন ফাঁস ব্যবহার করে তাদের দমন করেছে, সেই রাষ্ট্রকেও শেষ পর্যন্ত জনগণ পরিবর্তন করবে এই বার্তাই প্রকাশ পায় স্তবকের মাধ্যমে।
চারণকবি কবিতার শব্দার্থ :
চুঁইয়ে পড়া : ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরা, লোপাট : লুঠ করা, নিশ্চিহ্ন করা, ফাঁস : দড়ির বাঁধন, ঘূর্ণিপাকে : চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে, বজ্র : ঝড়বৃষ্টির সময় আকাশে আলোর ঝলকানির সঙ্গে প্রচণ্ড শব্দ, বিদ্যুৎ : ঝড়বৃষ্টিকালীন মেঘে উৎপন্ন আলোকরেখা, তড়িৎ, বজ্র, তুচ্ছ : নগণ্য, অবহেলিত, প্রলয়কর : ধ্বংস করে দেওয়া এমন ঝড়, বেদনা : যন্ত্রণায় চোখে জল আসা, কাঁপন : কেঁপে ওঠা, কম্পন, গরাদ : দরজা বা জানালার লোহা বা কাঠের শিক, লিপিকা : লেখকের রচিত লেখা, স্বর : কণ্ঠ থেকে বের হওয়া আওয়াজ, শব্দ, শস্ত্র : অস্ত্র, যা হাতে ধরে প্রহার করা যায়, কয়েদ : বন্দি করা, গর্দানে : ঘাড় ও গলা-সহ মাথা অবধি, জনতা : সাধারণ মানুষ, ফাঁসুড়ে : গলায় দড়ি পরিয়ে, মৃত্যুদণ্ড প্রদানের জন্য, ভারসাম্য : ওজনের সমতা বজায় রাখা, স্থিতাবস্থা, স্পর্ধা : সাহস।

আপনার কোনো মতামত থাকলে কমেন্ট করুন।