❖ লেখক-পরিচিতি : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০):
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক হলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার মুরাতিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকার মাঘ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘উপেক্ষিতা’ গল্পের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ছিল ‘পথের পাঁচালী’। পরে এই উপন্যাস অবলম্বনে বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ রচনাগুলিতে লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাব লক্ষ করা যায়। এছাড়াও তিনি বহু জনপ্রিয় উপন্যাস রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলির মধ্যে রয়েছে ‘আরণ্যক’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘বিপিনের সংসার’ এবং ‘ইছামতী’। এছাড়া ‘মেঘমল্লার’, ‘মৌরীফুল’, ‘তালনবমী’, ‘ক্ষণভঙ্গুর’ ও ‘উপলখণ্ড’ তাঁর প্রসিদ্ধ গল্পসংকলন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’, ‘হীরা মাণিক জ্বলে’ এবং ‘অভিযাত্রিক’-এর নামও উল্লেখ করা যায়। পরবর্তীকালে তাঁর অনেক গল্প ও উপন্যাস অবলম্বনে বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ১৯৫০ সালে নিজের বাড়িতেই এই বিশিষ্ট সাহিত্যিকের মৃত্যু হয়।
❖ 'পুঁইমাচা' গল্পের উৎস :
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সিদ্ধেশ্বর ঘোষের বাড়িতে গৃহশিক্ষকতা করতে যেতেন। সেখানে তিনি সিদ্ধেশ্বর বাবুর ছেলে ও বাড়ির অন্য ছোটোদের প্রায়ই নতুন গল্প শোনাতেন। সিদ্ধেশ্বর বাবুর ভাইপো মন্মথের অনুরোধে তিনি ‘পুঁই মাচা’ গল্পটি লেখেন। এটি প্রথমে হাতেলেখা পারিবারিক পত্রিকা ‘অবসারিকা’-তে প্রকাশিত হয়। পরে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ছাপা হয় এবং ১৯৩১ সালে ‘মেঘমল্লার’ গল্পসংকলনে স্থান পেয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
❖ 'পুঁইমাচা' গল্পের বিষয়বস্তু :
‘পুঁইমাচা’ বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য গল্প। খুব সাধারণ একটি ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখক এখানে একটি আবেগপূর্ণ কাহিনি গড়ে তুলেছেন। এই গল্পে সহায়হরি চাটুজ্যে নামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের পরিবারের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর পরিবারে স্ত্রী এবং তিনটি মেয়ে রয়েছে। একসময় তাঁর আভিজাত্য ও সম্পদ থাকলেও পরে তাঁর আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সংসারের খরচ চালানো তাঁর জন্য কঠিন হয়ে যায়। গল্পের প্রধান চরিত্র সহায়হরি ও তাঁর স্ত্রী অন্নপূর্ণার বড় মেয়ে ক্ষেন্তি। ক্ষেন্তি চঞ্চল স্বভাবের এবং খেতে খুব ভালোবাসে। তার প্রকৃত বয়স চোদ্দো-পনেরো হলেও সমাজের কাছে সহায়হরি তার বয়স প্রায় তেরো বছর বলে উল্লেখ করেন।
গল্পটির কাহিনি মূলত ক্ষেন্তিকে ঘিরেই এগিয়েছে। দরিদ্র ব্রাহ্মণ সহায়হরির পক্ষে তাঁর বড় মেয়ে ক্ষেন্তির বিয়ের ব্যবস্থা করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও তিনি একবার ক্ষেন্তির বিয়ের আয়োজন করেছিলেন। গ্রামের মাতব্বর কালীময় ঠাকুরের দেখাশোনায় মণিগাঁয়ের শ্রীমন্ত মজুমদারের ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়। পাত্রপক্ষ এসে ক্ষেন্তিকে আশীর্বাদ করেও যায়। কিন্তু কয়েকদিন পর সহায়হরি জানতে পারেন যে ছেলেটির চরিত্র ভালো নয়। নিজের গ্রামের এক কুলবধূর সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে গিয়ে সে ধরা পড়ে এবং মার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই কথা শোনার পর সহায়হরি সেই বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দেন।
সহায়হরি বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দেওয়ায় গ্রামের মাতব্বররা অস্বস্তিতে পড়েন। গ্রামসমাজের নিয়ম ভাঙা হয়েছে মনে করে চৌধুরীদের চণ্ডীমণ্ডপে তাঁকে একঘরে করার কথাও আলোচনা হয়। এই খবর অন্নপূর্ণার কানে পৌঁছালে তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং রাগ করে স্বামীকে কিছু কথা শোনান। কিন্তু সহায়হরি এ বিষয়ে তেমন উদ্বিগ্ন হন না। এদিকে বড় মেয়ে ক্ষেন্তিও এসব নিয়ে বিশেষ ভাবিত নয়। বাবা-মায়ের মধ্যে তার বিয়ের কথা নিয়ে ঝগড়া চলার সময় সে দুই বোন পুঁটি ও রাধীকে নিয়ে অনেক পাকা পুঁইশাক ও কিছু চিংড়ি মাছ জোগাড় করে আনন্দে বাড়ি ফিরে আসে। বিয়ের বয়সী মেয়ের এমন আচরণ দেখে অন্নপূর্ণা খুব রেগে যান। তিনি ছোট মেয়ে রাধীকে বলেন পুঁইশাকগুলো খিড়কি পুকুরের ধারে ফেলে দিতে। সহায়হরি একটু অনুরোধ করলেও তাতে কোনো ফল হয় না; রাধী মায়ের কথামতো সব ফেলে দিয়ে আসে।
রাগ করে পুঁইশাক ফেলে দিতে বললেও পরে রান্না করতে বসে অন্নপূর্ণার মনে বড় মেয়ে ক্ষেন্তির সরল ও দুঃখী মুখটি ভেসে ওঠে। তখন তিনি উঠোন ও খিড়কি দরজার পাশে পড়ে থাকা পুঁইডাটাগুলো কুড়িয়ে আনেন। এরপর চুপিচুপি চিংড়ি মাছ দিয়ে পুঁইশাক রান্না করেন। দুপুরে খাওয়ার সময় পাতে নিজের প্রিয় পুঁইশাকের তরকারি দেখে ক্ষেন্তি খুব খুশি হয়ে যায়। সে আনন্দ করে খেতে থাকে। মেয়ের তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া দেখে অন্নপূর্ণার মনও শান্ত ও আনন্দে ভরে ওঠে।
এদিকে আবার কালীময়ের চণ্ডীমণ্ডপে সহায়হরিকে ডাকা হয়। আশীর্বাদ হয়ে যাওয়ার পর বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দেওয়ার জন্য গ্রামের লোকেরা তাঁকে তিরস্কার করে। কিন্তু এতে সহায়হরি বিশেষ চিন্তিত হন না। এর কিছুদিন পর ক্ষেন্তি লুকিয়ে বরোজপোতার জঙ্গল থেকে প্রায় পনেরো-ষোলো সের ওজনের মেটে আলু তুলে আনে। পরে বিষয়টি বুদ্ধিমতী অন্নপূর্ণার চোখে পড়ে যায়। মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা না করে সহায়হরির এমন নির্লিপ্ত আচরণ দেখে অন্নপূর্ণা বাবা-মেয়ে দুজনকেই খুব বকাঝকা করেন।
কয়েকদিন পর অন্নপূর্ণা দেখেন ভাঙা পাঁচিলের পাশে গোলা জমিতে ক্ষেন্তি শীতের মধ্যেই একটি পুঁইচারা লাগাচ্ছে। অসময়ে গাছ লাগালেও সে মাকে বলে প্রতিদিন জল দিয়ে গাছটিকে বাঁচিয়ে রাখবে। এমনকি শীতের মধ্যেও মুখুজে বাড়ি থেকে গোবর কুড়িয়ে এনে গাছের যত্ন করে। এভাবেই সহায়হরির অভাবী সংসারে ভালোবাসা ও দুঃখের মধ্য দিয়ে দিন কাটতে থাকে। এরই মধ্যে পৌষ সংক্রান্তি আসে। দারিদ্র্যের মধ্যেও অন্নপূর্ণা সামান্য উপকরণে পিঠেপুলি বানান। মায়ের হাতে তৈরি সেই সাধারণ পিঠে খেয়েই রাধী, পুঁটি ও ক্ষেন্তি খুব আনন্দ পায়। ক্ষেন্তি চুপচাপ অনেকগুলো পিঠে খাওয়ার পরও যখন অন্নপূর্ণা আরও পিঠে চাই কিনা জিজ্ঞেস করেন, সে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। মেয়ের এই সরল স্বভাব দেখে অন্নপূর্ণা মনে মনে তার ভবিষ্যৎ সুখী জীবনের কথা ভেবে শান্তি অনুভব করেন।
বৈশাখ মাসের শুরুতে সহায়হরির এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের উদ্যোগে প্রায় চল্লিশ বছর বয়সি এক ব্যক্তির সঙ্গে ক্ষেন্তির বিয়ে হয়। এটি ছিল সেই পাত্রের দ্বিতীয় বিয়ে। অল্প যত্নে বড় হওয়া মেয়েকে অপরিচিত সংসারে পাঠাতে অন্নপূর্ণার মন খুব কষ্ট পায়। তখন তাকে সান্ত্বনা দেওয়া হয় যে আষাঢ় মাসে বাবাকে পাঠালে ক্ষেন্তি আবার বাড়ি আসতে পারবে। এই ভরসা নিয়েই ক্ষেন্তি শ্বশুরবাড়ির পথে যায়। কিন্তু সে আর নিজের বাড়িতে ফিরতে পারে না। বরপণের বাকি আড়াইশো টাকা দিতে না পারায় পাত্রপক্ষ তাকে এক বছরেও বাপের বাড়ি পাঠায় না। পরে ফাল্গুন মাসে ক্ষেন্তি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়। অসুস্থ অবস্থায় তার শরীরের সোনার গয়নাগুলো খুলে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে টালায় সহায়হরির এক দূর সম্পর্কের বোনের বাড়িতে রেখে আসে। সেখানেই শেষ পর্যন্ত ক্ষেন্তির মৃত্যু ঘটে।
মেয়ের এই দুঃখজনক মৃত্যুকে মেনে নিয়ে অন্নপূর্ণা আবার সময়মতো পৌষ সংক্রান্তিতে পিঠে বানাতে বসেন। পুঁটি ও রাধী আগের মতোই সেই কাজে সাহায্য করে। কিন্তু পিঠে খেতে বসে পুঁটির হঠাৎ দিদি ক্ষেন্তির কথা মনে পড়ে। তখন উৎসবের আনন্দের মধ্যেও সবার মন ভারী হয়ে ওঠে। ক্ষেন্তি আর নেই, তবে তার লাগানো পুঁইচারা এখনও উঠোনের কোণে রয়ে গেছে। মা ও মেয়েরা সেই গাছটির দিকে তাকিয়ে থাকে। যত্ন করে লাগানো সেই পুঁইগাছে নতুন সবুজ পাতা বেরিয়েছে এবং গাছটি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। যেন গাছটির মধ্যেই ক্ষেন্তির স্মৃতি বেঁচে আছে, যেমনভাবে সে বেঁচে থাকলে জীবনের আনন্দে ভরে উঠত।
❖ 'পুঁইমাচা' গল্পের শব্দার্থ :
উঠান : আঙিনা / ভীতি : ভয় / অব্যবহিত পূর্বের : ঠিক আগের, অল্পক্ষণ আগের / স্থিরভাব : নিশ্চল অবস্থা / মরিয়া : বেপরোয়া / প্রতীক্ষা : অপেক্ষা / আমতা আমতা : দ্বিধা করা, ইতস্তত ভাব / পূর্বাপেক্ষা : আগের থেকে / গুজব : জনরব / বাগদী : অনুন্নত বা নিম্নশ্রেণির বাঙালি হিন্দু জাতিবিশেষ / বিস্মিত : অবাক / পূর্ববৎ : আগের মতো / পুনর্বার : আবার / একঘরে করা : সমাজ থেকে বহিষ্কার করা / চন্ডীমণ্ডপ : ঠাকুরদালান বা গ্রামের বৈঠকের স্থান / তাচ্ছিল্য : অবজ্ঞা / মাতব্বর : গ্রামের প্রধান ব্যক্তি, মোড়ল / মুরোদ : সামর্থ্য, ক্ষমতা / যাড়ী মেয়ে : বিয়ের উপযুক্ত বয়সি মেয়ে / খিড়কি দুয়ার : বাড়ির পিছনের দরজা / জঞ্জাল : আবর্জনা / পক্ষাবলম্বন : কোনো পক্ষকে সমর্থন করা / কাতর : দুঃখে বা কষ্টে আচ্ছন্ন / অরন্ধন : রান্না না করার আচার / বন্দোবস্ত : ব্যবস্থা বা আয়োজন / বন্দোবস্ত : ব্যবস্থা বা আয়োজন / কুম্ভকার বধূ : কুমোরের স্ত্রী / প্রহার : মারধর, পিটুনি / শয্যাগত : অসুস্থ হয়ে বিছানায় থাকা / প্রস্তাব : আলোচনার বিষয় / দৃষ্টিনিক্ষেপ : দৃষ্টিপাত করা / সন্তর্পণে : খুব সাবধানে / ইহকাল-পরকাল : এই জীবন ও পরজন্ম / উত্থাপন : প্রসঙ্গ তোলা / ভূপতিত : মাটিতে পড়ে থাকা / বিপন্ন : বিপদগ্রস্ত / উত্তাপ : গরম / শীর্ণকায় : রোগা দেহ / প্রত্যাশা : আশা বা প্রতীক্ষা / পৌষ সংক্রান্তি : পৌষ মাসের শেষ দিনের পুণ্য তিথি / পবিত্রবস্ত্র : শুদ্ধ ও নির্মল কাপড় / ঈশৎ : সামান্য, একটু / সঙ্কোচ : দ্বিধা বা লজ্জা / উদ্ভাসিত : প্রকাশিত বা আলোকিত / ঘটকালি : বিয়ের ব্যবস্থা করা / আড়ষ্টতা : শক্ত বা জড়তা / উদ্বেল : ব্যাকুল বা অস্থির / আভিজাত্য : বংশমর্যাদা / নির্বাক : বাকরুদ্ধ বা হতবাক / নিস্তব্ধতা : সম্পূর্ণ নীরব অবস্থা / ভরপুর : সম্পূর্ণ ভরা।
🔹লেখকের শেষ মন্তব্য : আমাদের প্রকাশিত একাদশ শ্রেণির প্রথম সেমিষ্টার সাজেশন ই-বুকটিতে(PDF) বোর্ডের নতুন সিলেবাস ও নতুন প্রশ্নপত্রের নিয়ম মেনে প্রতিটি অধ্যায় থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর সহজ ও পরিষ্কারভাবে সাজানো হয়েছে। তাই একাদশ শ্রেণির প্রথম সেমিষ্টার সাজেশন ই-বুক(PDF)গুলি নিতে চাইলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা, আমাদের ওয়েবসাইটের উপরে Menu Option-এ ক্লিক করে বিস্তারিত তথ্য দেখে নিতে পারেন।
File Details :
PDF Name : পুঁইমাচা গল্পের বিষয়বস্তু PDF
Size : 1 MB
No. of Pages : 4
Mode : Read-only (Online)
Download Link : Click here To Download PDF
| আরো পড়ুন | প্রশ্নোত্তর |
|---|---|
| 1. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কবিতার বিষয়বস্তু PDF | Click here |
| 2. সাম্যবাদী কবিতার বিষয়বস্তু PDF | Click here |
| 3. বাঙ্গালা ভাষা প্রবন্ধের বিষয়বস্তু PDF | Click here |
| 4. তার সঙ্গে কবিতার বিষয়বস্তু PDF | Click here |
Regards,
WB Semester Team
Registered under MSME (Udyam), Govt. of India
All Legal Rights Reserved
Call & WhatsApp : 9883566115
