এই ব্লগটি সন্ধান করুন

ছুটি গল্পের বিষয়বস্তু, উৎস, প্রেক্ষাপট, নামকরণ, শব্দার্থ | Chuti Golpo Class 11

2

ভূমিকা : পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের (WBCHSE) নতুন সিলেবাস অনুযায়ী একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টারের বাংলা সিলেবাসে 'ছুটি' এবং 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' এই দুটি গল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই তোমাদের সুবিধার জন্য আমি এই পোস্টে 'ছুটি' গল্পের লেখক-পরিচিতি, উৎস, প্রেক্ষাপট, বিষয়বস্তু, নামকরণ এবং কঠিন শব্দার্থ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কারণ মূল গল্পটি পড়ার আগে এই বিষয়গুলি সম্পর্কে জানা উচিত। তাহলে তোমরা পাঠ্য মূল 'ছুটি' গল্পটি পড়ার সময় তার অর্থ ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য খুব সহজেই বুঝতে পারবে। চলো শুরু করা যাক!

(toc)
ছুটি গল্পের বিষয়বস্তু, উৎস, প্রেক্ষাপট, নামকরণ, শব্দার্থ

ছুটি গল্পের লেখক-পরিচিতি :

'ছুটি' গল্পের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও সাহিত্যসৃষ্টি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির গুণীজনদের পরিমণ্ডলে বড়ো হয়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথ প্রথাগত শিক্ষায় আবদ্ধ না থেকে জীবন ও পরিপার্শ্বের মধ্য দিয়ে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করেন। শিলাইদহে জমিদারি পরিচালনার পাশাপাশি পদ্মার তীরে বসে তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ ছোটোগল্পগুলি রচনা করেন, যার অন্যতম হলো 'ছুটি'। কবিতা, নাটক, উপন্যাস থেকে শুরু করে প্রবন্ধ ও ভ্রমণসাহিত্য সব শাখাতেই তাঁর সুখ্যাতি ছিল অসীম। মূল গল্পটি পড়ার আগে তাঁর সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে নীচের ছকটি দেখে নাও।

বিষয় তথ্য
জন্ম ও জন্মস্থান ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে (১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ), কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে।
পিতা-মাতা পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাদেবী। তিনি পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান ও অষ্টম পুত্র।
শিক্ষা নর্মাল স্কুলে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় মন বসেনি। বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে এবং ঠাকুরবাড়ির পরিমণ্ডলে হাতেকলমে শিক্ষা অর্জন।
কর্মজীবন পত্রপত্রিকার সম্পাদনা, ১৮৯১ সালে শিলাইদহে জমিদারি পরিচালনা, 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম' ও ১৯২১ সালে 'বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠা।
পারিবারিক জীবন ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে বিবাহ। পাঁচ সন্তান—মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা এবং শমীন্দ্রনাথ।
কাব্যগ্রন্থ 'হিন্দুমেলার উপহার' (প্রথম কবিতা, ১৮৭৫), 'কবি-কাহিনী' (প্রথম কাব্যগ্রন্থ, ১৮৭৮)। এছাড়া সন্ধ্যাসংগীত, কল্পনা, সোনার তরী, গীতাঞ্জলি, বলাকা, ক্ষণিকা, মানসী, শেষ লেখা, নবজাতক।
নাটক 'রুদ্রচন্দ্র' (প্রথম নাটক), 'বাল্মীকি প্রতিভা' (প্রথম গীতিনাট্য)। এছাড়া রাজা ও রানী, ডাকঘর (শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর প্রভাবযুক্ত), মুক্তধারা, রক্তকরবী, বিসর্জন, ফাল্গুনী।
উপন্যাস 'করুণা' (প্রথম উপন্যাস)। এছাড়া চার অধ্যায়, গোরা, যোগাযোগ, চতুরঙ্গ।
প্রবন্ধ ও অন্যান্য শিক্ষা, কালান্তর, মানুষের ধর্ম, সাহিত্য, সাহিত্যের পথে, চারিত্র পূজা, স্বদেশ। এছাড়াও নানা পত্রসাহিত্য ও ভ্রমণসাহিত্য রচনা করেছেন।
পুরস্কার 'গীতাঞ্জলি'র ইংরেজি অনুবাদ Gitanjali (Song Offerings)-এর জন্য ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই নভেম্বর নোবেল পুরস্কার লাভ।
মৃত্যু ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট জোড়াসাঁকোয় তাঁর জীবনাবসান হয়।

ছুটি গল্পের উৎস :

জন্ম ও পরিচয় : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছুটি গল্পটি লিখেছিলেন পৌষ মাসে ১২৯৯ বঙ্গাব্দে। এবং ছুটি গল্পটি ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় সাধনা পত্রিকায়। অবশেষে ছুটি গল্পটি গল্পগুচ্ছ - এর অন্তর্ভুক্ত হয়।

ছুটি গল্পের প্রেক্ষাপট :

রবীন্দ্রনাথের নিজের চোখে দেখা পদ্মাপাড়ের এক আনন্দপূর্ণ ছেলেমানুষির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল 'ছুটি' গল্পের প্রেক্ষাপট। একদিন তিনি দেখেন, ছেলেদের খেলার একটি মাস্তুলের ওপর একটি ছোটো মেয়ে গম্ভীরভাবে বসে পড়ে। খেলায় বাধা পড়লে একজন তাকে সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সে নিশ্চিন্ত মনে বসেই থাকে। এরপর সবচেয়ে বড়ো ছেলেটি তাকে উঠে যেতে বললে সে কারও কথা শুনে না। অবশেষে জোর করে মেয়েটিকে সরানো হলে ছেলেদের মধ্যে আবার আনন্দধ্বনি ওঠে এবং খেলা শুরু হয়।
জমিদারি দেখাশোনার কাজে শিলাইদহ, সাজাদপুর ও পতিসরে ঘোরার সময় পদ্মাতীরের অপরূপ প্রকৃতি কবির মনকে গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল। মানুষের সঙ্গে মিশে তিনি গ্রামীণ মানুষের অন্তরের কথা উপলব্ধি করেন। তিনি বুঝতে পারেন, গ্রামের মানুষের এই সহজসরল প্রাণময়তাকে এক লহমায় ম্লান করে দিতে পারে হৃদয়হীন শহুরে সংস্কৃতি। প্রকৃতির কোলে ঘটা এসব সামান্য ঘটনাগুলিই তাই তাঁর চোখে অসামান্য হয়ে উঠেছিল।
বাস্তব ঘটনার সঙ্গে নিজের কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়েই রবীন্দ্রনাথ 'ছুটি' গল্পটি রচনা করেন। 'সাহিত্য, গান ও ছবি'-তে তিনি জানিয়েছেন, বাংলার নদীতে ঘুরে তিনি পল্লির বিচিত্র জীবনযাত্রা দেখেছেন। সারা গ্রাম মাতিয়ে বেড়ানো এক দুরন্ত ছেলেকে হঠাৎ মামার কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার যে বাস্তব দৃশ্য তিনি দেখেছিলেন, তার সঙ্গে কল্পনা মিশিয়েই গল্পটি তৈরি করেছেন। প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার নিদারুণ যন্ত্রণাই হলো 'ছুটি' গল্পের মূল উপজীব্য।

ছুটি গল্পের চরিত্রসমূহ:

আলোচ্য গল্পটিতে মূলত গ্রাম ও শহরের পরিবেশের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের দেখা পাওয়া যায়। প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে 'ছুটি' গল্পের প্রধান চরিত্রগুলোর পরিচয় ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
ফটিক চক্রবর্তী : গল্পের প্রধান চরিত্র। প্রকৃতিলগ্ন মুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই দুরন্ত কিশোর মায়ের বকুনিতে অভিমান করে মামার সঙ্গে কলকাতায় চলে যায়। কিন্তু সেখানে মামির স্নেহহীন আচরণ ও অবহেলায় সে চরম মানসিক অবসাদের শিকার হয়। বন্দিজীবনে হাঁপিয়ে ওঠা ফটিক প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হয়ে করুণ পরিণতির মুখে ঢলে পড়ে।
মাখন : ফটিকের ছোটো ভাই। মায়ের চোখে সে শান্ত ও বিদ্যানুরাগী হলেও আদতে অত্যন্ত জেদি। খেলায় দাদার নির্দেশ অমান্য করে নিজে পড়ে গিয়ে সে দাদাকেই আক্রমণ করে।
ফটিকের মা : ফটিক ও মাখনের বিধবা মা। ফটিকের দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ হয়ে ছেলের মঙ্গলের জন্যই তিনি তাকে দাদার (বিশ্বম্ভরবাবুর) কাছে কলকাতায় পাঠান। গল্পের শেষে মুমূর্ষু ফটিকের শয্যাপাশে তিনি ছুটে আসেন।
বিশ্বম্ভরবাবু (মামা) : ফটিকের মামা। বহুকাল পর দেশে ফিরে তিনি ফটিকের দায়িত্ব নিয়ে তাকে কলকাতায় নিয়ে যান। গল্পের শেষে ফটিকের চরম অসুস্থতার সময় তিনিই বোনকে খবর দিয়ে আনান।
ফটিকের মামি : বিশ্বম্ভরবাবুর স্ত্রী। পাড়াগাঁয়ের ছেলে ফটিককে তিনি প্রথম থেকেই 'দুর্গ্রহ' বা উপদ্রব মনে করতেন। তাঁর বকুনি ও মমতাহীন আচরণে কলকাতায় ফটিকের জীবন নরকে পরিণত হয়েছিল।
মামাতো ভাইয়েরা : ফটিকের মামার সন্তানরা। কলকাতায় তারা ফটিককে অবজ্ঞা করত এবং গ্রাম্য ফটিকের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক স্বীকার করতেও লজ্জা পেত।
বাঘা : চক্রবর্তী বাড়ির ভৃত্য, যে বলপ্রয়োগ করে অবাধ্য ফটিককে তার মায়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিল।
মাস্টারমশাই ও সহপাঠীরা : ফটিকের কলকাতার শিক্ষক ও বন্ধুরা। পড়াশোনায় অমনোযোগী ফটিক মাস্টারমশাইয়ের প্রহার নীরবে সহ্য করত এবং সহপাঠীদের সঙ্গেও সে মিশতে পারত না।
পুলিশ ও চিকিৎসক : জ্বরের ঘোরে ফটিক মামাবাড়ি থেকে পালালে পুলিশ তাকে খুঁজে ফিরিয়ে দেয়। এরপর চিকিৎসক এসে জানান, তার সুস্থ হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।

ছুটি গল্পের সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু :

গ্রামের বালকদের সর্দার ছিল দুরন্ত স্বভাবের ফটিক। ফটিকের নেতৃত্বেই গ্রামের ছেলেরা নতুন নতুন খেলার উদ্ভাবন করত। এরকমই একদিন নদীর ধারে রাখা শালগাছের গুঁড়িকে নিয়ে খেলার সময় ফটিকের ছোটোভাই মাখনলাল তার ওপরে চেপে বসে। তখন মাখনলালকে সুদ্ধ সেই শালকাঠের গুঁড়িটিকে গড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং মাখন মাটিতে পড়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ফিরে গিয়ে সে মার কাছে ফটিকের নামে অভিযোগ করে যে, ফটিক তাকে মেরেছে। ফটিকের মা-র নির্দেশে ফটিককে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। ফটিক ভাইকে মারার কথা অস্বীকার করে, কিন্তু মাখন মারার অভিযোগ জারি রাখে। কুদ্ধ ফটিক মিথ্যে কথা বলার জন্য এবার মাখনকে সত্যিই চড় মারে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে মা ফটিককে পালটা চড় মারলে ফটিক মা-কে ঠেলে দেয়। এই নিয়ে যখন গোলযোগ চলছে, তখনই ফটিকদের বাড়িতে আগমন ঘটে তার মামা বিশ্বম্ভরবাবুর, যিনি পশ্চিমে কাজের জন্য বহুদিন বাইরে ছিলেন। তার আসার ফলে বাড়িতে বেশ সমারোহ হয়। বিদায় নেওয়ার কয়েকদিন আগে বিশ্বম্ভরবাবু তাঁর বোনের কাছে যখন ভাগিনাদের পড়াশোনার খবর নেন, তখন ফটিকের মা মাখনের প্রশংসা করলেও, ফটিকের ব্যাপারে নানা অভিযোগ জানান। বিশ্বম্ভরবাবু ফটিককে উপযুক্ত লেখাপড়া শেখানোর জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। ফটিকের মা তাতে সম্মতি দেন। ফটিকও এই প্রস্তাবে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। সে যাওয়ার সময় তার সমস্ত খেলার জিনিসগুলি মাখনলালকে উদারভাবে দান করে দিয়ে যায়। কিন্তু মামার বাড়িতে মামির তরফ থেকে সে প্রত্যাশিত অভ্যর্থনা পায় না, তার মামি তাকে নিজের সংসারে অবাঞ্ছিত মনে করেন। ফটিকের যে বয়স অর্থাৎ কৈশোর এবং যৌবনের মধ্যবর্তী সময়কাল, তা সাধারণভাবে সমাজে খুব গ্রহণযোগ্য হয় না। ফটিকের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নানা কারণে নানাভাবে তাকে একাধিকবার তিরস্কৃত হতে হয়। ধীরে ধীরে বাড়ির জন্য, গ্রামের জন্য মন খারাপের এক অনুভূতি ফটিকের সমস্ত মনকে অধিকার করে নেয়, সেইসঙ্গে তার অসহায় মন মা-র জন্য আকুল হয়ে ওঠে।
স্কুলে পাঠ অমনোযোগী ফটিককে প্রায় নিয়মিত শিক্ষকের মার খেতে হত। বই হারিয়ে ফেলার ঘটনায় তার সমস্যা আরও বেড়ে যায়। কারণ, স্কুলের পড়া তৈরি করে আসা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যে, তার মামাতো ভাইরা তার সঙ্গে সম্পর্কের কথা স্বীকার করতে লজ্জাবোধ করত, বরং কোনোভাবে ফটিক অপ্রস্তুত হলে তারা আনন্দ উপভোগ করত। একদিন মামির কাছে নিরুপায় হয়ে বই হারানোর কথা বললে ফটিককে আবারও তিরস্কৃত হতে হয়। অভিমানী ফটিকের মনে হয় পরের পয়সা নষ্ট করে সে অনুচিত কাজ করছে। মায়ের প্রতি তার অভিমান তীব্রতর হয়। এই সময়েই একদিন ফটিক স্কুল থেকে ফেরার পরে অসুস্থ বোধ করে। তার জ্বর আসে। সে বুঝতে পারে যে এই অসুস্থতা তার মামির কাছে এক অনাবশ্যক উপদ্রব হয়ে উঠতে পারে, আর সে কারণেই পরদিন সকালে ফটিক নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
চারপাশে তার খোঁজ পাওয়া যায় না। বিশ্বম্ভরবাবু পুলিশে খবর দিতে বাধ্য হন। সন্ধ্যার সময় পুলিশের গাড়িতে ফটিককে ফিরিয়ে আনা হয়। তখন তার অসুস্থতা বেড়ে গিয়েছে। সমস্ত রাত্রি সে প্রলাপ বকতে থাকে। মায়ের জন্য সে আকুল হয়ে ওঠে। বিশ্বম্ভরবাবু সে সময়ে ফটিকের পাশে থাকেন। ফটিকের মাকে খবর দেওয়া হয়। ফটিকের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। ডাক্তারবাবুও শঙ্কা প্রকাশ করেন। এরকম সময়ে ফটিকের মা আসেন। ফটিকের অসুস্থতায় তিনি আর্তনাদ করে ওঠেন। ফটিক কাউকে লক্ষ না করেই পাশ ফিরে মৃদুস্বরে মা-কে উদ্দেশ করে বলে যে তার ছুটি হয়েছে, সে বাড়ি যাচ্ছে।

ছুটি গল্পের নামকরণ :

সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মধ্য দিয়েই পাঠক রচনার আসল অর্থ বুঝতে পারে। সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত বিষয়, বিশেষ কোনো ঘটনা, চরিত্র বা ব্যঞ্জনার ওপর ভিত্তি করে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ছুটি' গল্পের নামকরণটি সম্পূর্ণ ব্যঞ্জনাধর্মী।
গল্পের মুখ্য চরিত্র, প্রকৃতিলালিত প্রাণচঞ্চল কিশোর ফটিক চক্রবর্তীর জীবনের ক্রমপরিণতিই এই রচনার মূল বিষয়। পল্লিবাংলার উদার পরিবেশে বেড়ে ওঠা ফটিক ভাইয়ের মিথ্যাচার ও মায়ের ভর্ৎসনায় অভিমান করে মামার সঙ্গে শহরে চলে যায়। কিন্তু কলকাতায় গিয়ে সে বুঝতে পারে, মামির কাছে সে এক অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব বা দুর্গ্রহ। মামির স্নেহহীন ও নির্মম আচরণ, মামাতো ভাইদের অবজ্ঞা এবং শহরের হৃদয়হীন পরিবেশে সে হাঁপিয়ে ওঠে। সে তার গ্রামজীবনের মুক্তিতে ফিরে যেতে চায়। মামার কাছে সে জানতে পারে, কার্তিক মাসে পুজোর ছুটি পড়লে তবেই সে বাড়ি যেতে পারবে।
কিন্তু তার আর বাড়ি ফেরা হয় না। একদিন জ্বরাক্রান্ত ফটিক মামিকে জ্বালাতন না করার জন্য বর্ষামুখর রাতে বাড়ি ছাড়ে। পুলিশ তাকে ফিরিয়ে আনলেও বৃষ্টিতে ভিজে তার শারীরিক অবস্থার আরও খারাপ হয়। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকতে বকতে সে অনুভব করে তার ছুটি হয়েছে। মুমূর্ষু অবস্থায় মায়ের কাছে তার শেষ গভীর ব্যঞ্জনাবাহী কথাটি ছিল "মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে মা, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি।" বাস্তব জগতের নিষ্ঠুরতা থেকে চিরকালের মতো 'ছুটি' নিয়ে ফটিক বিশ্বপ্রকৃতির অনন্ত রহস্যে বিলীন হয়ে যায়। তাই বলা যায়, গল্পটির এই প্রতীকী ও ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণ সর্বাংশে সার্থক।

ছুটি গল্পের কঠিন শব্দার্থ :

শব্দ অর্থ
মাস্তুলনৌকার পাল খাটানোর কাঠের দন্ড-বিশেষ
উপক্রমসূচনা
ঈষৎঅল্প
বিচলিতঅস্থির বা চঞ্চল
প্রগলভতালজ্জাহীনতা
সংকীর্ণঅপ্রশস্ত
স্রোতস্বিনীনদী
অর্ধনিমগ্নঅর্ধেক ডুবে থাকা
দৈবাৎহঠাৎ
ধাউসঅতি বৃহৎ আকৃতি
চপেটাঘাতহাত দিয়ে মারা
এতাদৃশএরকম
অকাল-তত্ত্বজ্ঞানীঅকালে যাঁর তত্ত্বজ্ঞান হয়েছে
অধরঠোঁট বা নিচের ঠোঁট
প্রলাপঅর্থহীন কথাবার্তা
দুঃসহযা সহ্য করা যায় না
প্রতিভাতউজ্জ্বলরূপে প্রকাশিত
শঙ্কিতভীত
গর্দভগাধা
অসারতাঅর্থহীনতা বা তুচ্ছতা
উৎপাটনউপড়ে নেওয়া
পুত্রেপৌত্রাদিক্রমেবংশ পরম্পরায়
দুগ্রহদুষ্ট বা অশুভ গ্রহ
আনুষঙ্গিকমূল বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত
ভূমিসাৎমাটিতে পড়ে যাওয়া
কুশ্রীকুৎসিত
লালিত্যসৌন্দর্য, কমনীয়তা
স্বরচিতনিজের দ্বারা রচিত
রাগিনীরাগ থেকে তৈরি হওয়া সুর
অনুমোদনসমর্থন বা মঞ্জুরি
কার্যে প্রবৃত্ত হইবারকাজে নিযুক্ত বা রত হওয়ার
আস্ফালন চিৎকার
গণ্ডদেশকপোল বা গাল
তৃণমূলঘাসের শিকড় বা ঘাসের গোড়া
ক্ষুণ্ণব্যথিত বা মনে মনে কষ্ট পাওয়া
সহৃদয়হৃদয়যুক্ত বা দয়ালু
বিরাগবিরক্তি
শশব্যস্তশশ অর্থাৎ খরগোশের মতো চঞ্চল (অতি চঞ্চল)
গৃহাভিমুখেবাড়ির দিকে
ঔদাসীন্যউদাসীনতা
বিমর্ষবিষণ্ণ বা দুঃখ
গলুইনৌকার দু-প্রান্তের সরু অংশ
আড়কোলাআড়াআড়িভাবে কোলের উপরে শুইয়ে নেওয়ার বিশেষ ভঙ্গি
অহর্নিশিদিনরাত
নাচারনিরুপায় বা অসহায়
ভাবোদয়ভাবের সঞ্চার (মনে নতুন ভাবের সৃষ্টি হওয়া)
অনতিবিলম্বেদেরি না করে
বাঁওজলের গভীরতা মাপার একক
কিঞ্চিৎঅল্প
নিরীক্ষণমনোযোগের সঙ্গে দেখা

ছুটি গল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নসমূহ :

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছুটি গল্পে মামাবাড়িতে গিয়ে ফটিকের যে দুরবস্থা হয়েছিল তা নিজে আলোচনা করো।
২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছুটি গল্পের মূল চরিত্র ফটিক সম্পর্কে আলোচনা করো।
৩. ছুটি গল্পে ফটিকের মামির চরিত্র আলোচনা করো নিজের ভাষায়।
৪. "তাহাই উপলব্ধি করিয়া বালকেরা এ প্রস্তাবে সম্পূর্ণ অনুমোদন করিল"- বালকেরা কোন প্রস্তাবে কেন অনুমোদন করেছিল ? এই প্রস্তাব কার্যকরী করার পথে কোন বাধা উপস্থিত হয়েছিল আলোচনা করো।
৫. তিনি ঈষৎ ক্ষুন্ন হইলেন। ক্ষুন্ন কে হয়েছিলেন এবং কেন তিনি ক্ষুন্ন হয়েছিলেন আলোচনা করো।
এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে নিচে দেওয়া 'ছুটি গল্প সম্পর্কিত ও অন্যান্য পোস্টসমূহ' অংশে যান। সেখানে প্রদত্ত লিংকে ক্লিক করলেই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।

❖ লেখকের শেষ কথা : আশা করছি, 'ছুটি' গল্পের এই ব্লগ পোস্টটি পড়ে তুমি এই গল্পটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা অর্জন করতে পেরেছো। এরপর যদি ক্লাস 11 দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য 'ছুটি' গল্পের খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তরের প্রয়োজন হয়, তাহলে নিচে দেওয়া 'ছুটি গল্প সম্পর্কিত ও অন্যান্য পোস্টসমূহ' পয়েন্টটি দেখো। সেখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের লিঙ্ক দেওয়া হয়েছে।

ছুটি গল্প সম্পর্কিত ও অন্যান্য পোস্টসমূহ :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

আপনার কোনো মতামত থাকলে কমেন্ট করুন।