এই ব্লগটি সন্ধান করুন

হলুদ পোড়া গল্পের বিষয়বস্তু | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা গল্প

0

ভূমিকা : WBCHSE বোর্ডের ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গল্প হল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'হলুদ পোড়া'। তাই তোমাদের সুবিধার জন্য আমি এখন 'হলুদ পোড়া' গল্পের লেখক-পরিচিতি, উৎস, প্রেক্ষাপট, বিষয়বস্তু, নামকরণ এবং কঠিন শব্দার্থ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কারণ মূল গল্পটি পড়ার আগে এই বিষয়গুলি সম্পর্কে জানা উচিত। তাহলে তোমরা পাঠ্য 'হলুদ পোড়া' গল্পটি পড়ার সময় তার অর্থ ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য খুব সহজেই বুঝতে পারবে।

হলুদ পোড়া গল্পের লেখক-পরিচিতি :

জন্ম ও পরিচয় : বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত পরিচিত ও বাস্তববাদী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ সালের ১৯ মে ঝাড়খণ্ডের (তৎকালীন বিহার) দুমকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম ছিল প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু গায়ের রং কালো হওয়ায় ছোটোবেলায় সবাই তাঁকে আদর করে 'মানিক' বলে ডাকত এবং এই নামেই তিনি পরে সবার কাছে পরিচিত হন। বাবার বদলির চাকরির কারণে তাঁর ছোটোবেলা কেটেছে বাংলা আর বিহারের নানা জায়গায়।
ছোটোবেলা ও শিক্ষাজীবন : ছোটোবেলায় তিনি ভীষণ দুরন্ত ছিলেন। মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে লুকিয়ে মাঝিদের নৌকায় বা ঘোড়ার আস্তাবলে গিয়ে বসে থাকতেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। পড়াশোনায় তিনি বেশ ভালো ছিলেন। মেদিনীপুরের স্কুল থেকে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করার পর ১৯২৮ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অঙ্কে অনার্স নিয়ে ভরতি হন। কিন্তু লেখালেখির নেশা তাঁকে এমনভাবে পেয়ে বসে যে, তাঁর আর কলেজের পড়া শেষ করা হয়নি।
কর্মজীবন ও লেখক হয়ে ওঠা : তাঁর লেখক হওয়ার পেছনের গল্পটা বেশ মজার। নামীদামি পত্রিকা অচেনা লেখকদের লেখা ছাপে না-বন্ধুর এই ধারণা ভুল প্রমাণ করতে তিনি 'অতসী মামী' নামের একটি গল্প লিখে 'বিচিত্রা' পত্রিকায় জমা দেন। গল্পটি ছাপা হয় এবং সবার খুব পছন্দও হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন পত্রিকা থেকে তাঁর কাছে লেখার অনুরোধ আসতে শুরু করে এবং তিনি পুরোপুরি লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে নেন। ১৯৩৭ সালে 'বঙ্গশ্রী' পত্রিকার সহ-সম্পাদকের কাজ করলেও মালিকের সঙ্গে মতের অমিল হওয়ায় তা ছেড়ে দিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে একটি ছাপাখানা খোলেন। সারাজীবন তাঁকে নিদারুণ অভাবের সঙ্গেই লড়াই করতে হয়েছে।
সাহিত্যকর্ম : তাঁর প্রথম দিকের লেখায় মানুষের মনের ভেতরকার জটিল দিক এবং শেষের দিকে কার্ল মার্কসের চিন্তাভাবনার প্রভাব দেখা যায়। জীবনে তিনি মোট ৫৭টি বই লিখেছেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে 'পদ্মানদীর মাঝি', 'পুতুলনাচের ইতিকথা', 'জননী' অন্যতম। এছাড়াও 'প্রাগৈতিহাসিক', 'সরীসৃপ', 'ছোটো বকুলপুরের যাত্রী'-এর মতো চমৎকার সব ছোটোগল্প তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন।
জীবনাবসান : এই প্রতিভাবান মানুষটি খুব বেশি দিন বাঁচেননি। সারাজীবন চরম অভাব আর নানা অসুখে ভুগে ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর, মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান।

হলুদ পোড়া গল্পের উৎস ও প্রকাশনা :

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হলুদ পোড়া' গল্পটা মূলত ১৯৪৫ সালে বের হওয়া 'হলুদ পোড়া' নামেরই একটা গল্পের বইয়ের প্রধান গল্প। তবে এই গল্পটা সবার আগে ছাপা হয়েছিল ১৩৪৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে, 'পরিচয়' পত্রিকার শারদ সংখ্যা বা পুজোর সংখ্যায়।
মজার ব্যাপার হলো, বইটিতে 'হলুদ পোড়া' গল্পটা একেবারে শুরুতেই রাখা হয়েছিল। কিন্তু পত্রিকায় ছাপার দিক থেকে দেখলে এর আগে লেখকের 'ধাক্কা', 'জন্মের ইতিহাস', 'ওমিললাইন', 'বোমা', 'ভাঙা ঘর' আর 'ফাঁদ'-এর মতো বেশ কয়েকটা গল্প বেরিয়ে গিয়েছিল।
পরে ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে লেখকের নিজের পছন্দের গল্পগুলো নিয়ে যখন 'স্বনির্বাচিত গল্প' নামের একটি বই বের হয়, তখন 'হলুদ পোড়া' গল্পসংকলন থেকে যে তিনটি গল্প সেখানে জায়গা পেয়েছিল, তার মধ্যে এটি ছিল অন্যতম।
এই গল্পটার কিন্তু ইংরেজি অনুবাদও হয়েছে। কল্যাণী ঘোষের অনুবাদ করা 'Burnt Turmeric' গল্পটি জায়গা পেয়েছে মালিনী ভট্টাচার্যের সম্পাদনা করা 'Selected Stories' বইতে। আবার দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের 'Primeval and Other Stories' নামের বইতেও ঠিক একই নামে গল্পটার খোঁজ মেলে, তবে সেখানকার অনুবাদক ছিলেন অমলেন্দু সেনগুপ্ত।

হলুদ পোড়া গল্পের চরিত্র ও সম্পর্ক :

বলাই চক্রবর্তী : গ্রামের এক মাঝবয়সি তাগড়া জোয়ান। ঘোষদের মজা পুকুরপাড়ের গজারি গাছের তলায় তার লাশ পাওয়া যায়। সম্পর্কে সে নবীনের কাকা।
শুভ্রা : ষোলো-সতেরো বছরের রোগাপাতলা, ভিতু স্বভাবের সাধারণ এক মেয়ে। সে সন্তানসম্ভবা ছিল এবং বাড়ির পেছনের ডোবার ঘাটে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। সম্পর্কে সে ধীরেনের বোন।
নবীন : মৃত বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো এবং দামিনীর স্বামী। কাকার খুনিকে যে ধরে দিতে পারবে, তাকে সে পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার দেবে বলে ঘোষণা করেছিল।
দামিনী : নবীনের বউ। মৃত শুভ্রার আত্মা প্রথম এই দামিনীর ঘাড়েই ভর করেছিল।
ধীরেন : শুভ্রার দাদা এবং শান্তির স্বামী। গ্রামের ইশকুলের মাস্টার এই মানুষটি বেশ উচ্চশিক্ষিত ও যুক্তিবাদী। মানুষের সেবা করাই তার কাজ, তবে তার চরিত্রে বেশ কিছু অমিল দেখা যায়। একসময় সে ভীষণ অবসাদে ভুগে নিজের যুক্তি ভুলে কুসংস্কারের কাছে হার মানে এবং গল্পের শেষে তার ওপরই মৃত বলাইয়ের আত্মা ভর করে।
কুঞ্জ মাঝি : এলাকার নামকরা গুনিন বা ওঝা। লোকটা ভীষণ ধূর্ত, নির্দয় এবং মানুষের মনে কুসংস্কার ও ভয় ঢোকাতে ওস্তাদ, যদিও তার নিজের মনেও ভয় লুকিয়ে আছে। তার বিশেষ পদ্ধতিতেই ধরা পড়ে যে মৃত মানুষের আত্মা ভর করেছে।
পঙ্কজ ঘোষাল : গ্রামের এক বয়স্ক মানুষ। মৃত বলাই চক্রবর্তীর দয়াতেই তিনি আর তাঁর গোটা পরিবার বেঁচে বর্তে ছিলেন।
কৈলাশ : পেশায় পাস-করা ডাক্তার। দামিনী যখন খুব ছটফট আর অশান্তি করছিল, তখন এই ডাক্তারের চিকিৎসাতেই সে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
শান্তি: মাস্টার ধীরেনের বউ।
ক্ষেন্তিপিসি : সম্পর্কে শান্তির পিসি হন। তাঁর কথা শুনেই শান্তি ভূত আটকাতে শোওয়ার ঘর আর রান্নাঘরের মাঝখানে দু-দিক পোড়ানো কাঁচা বাঁশ ফেলে রেখেছিল।
মথুরবাবু : ইশকুলের সেক্রেটারি। তাঁর নির্দেশেই হেডমাস্টারমশাই ধীরেনকে এক মাসের ছুটি দিয়ে দেন।

হলুদ পোড়া গল্পের প্রেক্ষাপট :

'হলুদ পোড়া' গল্পের প্রেক্ষাপট হলো কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসে ঘেরা একটি সাধারণ গ্রাম। বিশ-তিরিশ বছর ধরে শান্ত থাকা এই গ্রামে কার্তিক মাসে হঠাৎ তিনদিনের ব্যবধানে বলাই চক্রবর্তী আর গর্ভবতী শুভ্রার খুন সবাইকে চরম আতঙ্কে ফেলে দেয়।
গ্রামের মানুষ খুনের আসল কারণ খোঁজার বদলে ভূত-প্রেত আর অশরীরী আত্মার গুজবে মেতে ওঠে। কুঞ্জ গুনিন তন্ত্রমন্ত্র আর পোড়া হলুদের ভয় দেখিয়ে মানুষের মনে এই অন্ধবিশ্বাস আরও পাকাপোক্ত করে। চারপাশের এই ভয়ংকর আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশ এতটাই প্রবল ছিল যে, ধীরেনের মতো শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী মানুষও শেষপর্যন্ত মানসিক অবসাদে ভুগে এই ভয়ের কাছেই আত্মসমর্পণ করে।

হলুদ পোড়া গল্পের বিষয়বস্তু :

কোনো এক বছর কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ের কথা। মাত্র তিনদিনের এদিক-ওদিকে গ্রামে পরপর দুটো খুন হয়ে গেল। গ্রামের দক্ষিণ দিকে ঘোষদের একটা শুকনো মজা পুকুর আছে, সেখানকার একটা মরা গজারি গাছের তলায় পাওয়া গেল বলাই চক্রবর্তীর লাশ। বলাই ছিল মাঝবয়সি এক তাগড়া জোয়ান। কেউ হয়তো লাঠি দিয়ে এমন মেরেছিল যে তার মাথাটা ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে, গ্রামের আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই ছিল ষোলো-সতেরো বছরের রোগা আর ভিতু স্বভাবের মেয়ে শুভ্রা। মেয়েটা সন্তানসম্ভবা ছিল বলে দেড় বছর পর মাসখানেক আগে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে এসেছিল। সন্ধেবেলা গ্রামে যখন শেষ বাতিটা জ্বলে উঠেছে, ঠিক সেই সময় বাড়ির পেছনের ডোবার ঘাটে কে বা কারা তাকে গলা টিপে মেরে ফেলে রেখে যায়। বলাই চক্রবর্তীর মতো মানুষের এমন পরিণতিতে গ্রামের লোক খুব একটা অবাক না হলেও, শুভ্রার মৃত্যুটা কেউ মেনে নিতে পারেনি। গ্রামে গত কুড়ি-তিরিশ বছরে কারও সামান্য জখমও হয়নি, তাই দুটো খুনের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে সবাই ভাবতে থাকে। কিন্তু দুজনের মধ্যে কোনো চেনাজানা না থাকায় এসব শুধু গুজব হয়েই রয়ে যায়।
বলাই মারা যাওয়ার পর তার সম্পত্তির মালিক হয় তার ভাইপো নবীন। সে ঘোষণা করে দেয়, কাকার খুনিকে যে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। শহরের চাকরি ছেড়ে নবীন গ্রামে আসার একুশ দিন পর এক সন্ধাবেলায় নবীনের বউ দামিনীর হঠাৎ কী যেন হয়। গ্রামের লোকেরা যাকে বলে 'গায়ে বাতাস লাগা', দামিনীও ঠিক সেভাবেই ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। তখন শুভ্রার দাদা ধীরেনকে ডাকা হয়। ধীরেন কোনো ডাক্তারি পাস না করলেও গ্রামের একমাত্র ডাক্তার সে-ই। ধীরেন বড়ো ডাক্তার কৈলাসকে ডাকার কথা বলে। কিন্তু গ্রামের বয়স্ক মানুষ পঙ্কজ ঘোষাল বলেন কুঞ্জ গুনিনকে ডাকতে। ধীরেনের এতে ঘোর আপত্তি থাকলেও, নবীন দুজনকেই গুরুত্ব দেন। সে দু্জনকেই ডেকে পাঠায়।
প্রথমে সেখানে এসে হাজির হয় কুঞ্জ গুনিন। সে দামিনীর এলোচুলগুলি বারান্দার খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তার ওপর নানা মন্ত্র পড়তে শুরু করে। গ্রামের মানুষ ভয়ে ভয়ে সেই দৃশ্য দেখতে থাকে। একসময় দামিনীর চোখ বুজে আসে আর শরীরটা একদম শান্ত হয়ে যায়। তখন কুঞ্জ গুনিন একটা কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে দামিনীর নাকের কাছে ধরতেই তার ঢুলে আসা চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে যায়। সে নিজেকে 'শুভ্রা' বলে পরিচয় দেয় আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জানিয়ে দেয় যে বলাই খুড়ো অর্থাৎ বলাই চক্রবর্তীই তাকে খুন করেছে। এরপর আর হাজার চেষ্টা করেও বা নাকে হলুদ পোড়া ধরেও তার মুখ থেকে একটা কথাও বের করা যায় না।
এমন সময় কৈলাস ডাক্তার এসে হাজির হন এবং কুঞ্জ গুনিনের এসব কাণ্ডকারখানা বন্ধ করে দেন। এই অপবিজ্ঞানের চর্চার জন্য তিনি গুনিনকে খুব বকাঝকা করেন আর থানায় ডায়েরি করার ভয় দেখান। এরপর তিনি দামিনীকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দেন। তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগেও দামিনী সেই একই কথা বলে যে সে চাটুয্যে বাড়ির শুভ্রা। এই কথা শুনে সবার মনেই একটা খটকা লাগে। শুভ্রা খুন হওয়ার তিন দিন আগেই তো বলাই মারা গেছে, তাহলে একটা মরা মানুষ কীভাবে কাউকে খুন করতে পারে! তখন পঙ্কজ ঘোষাল আর কুঞ্জ গুনিন সবাইকে বুঝিয়ে বলে যে, বলাইয়ের আত্মা নিশ্চয়ই কোনো জ্যান্ত মানুষের ঘাড়ে ভর করে শুভ্রাকে খুন করিয়েছে।
এইসব কথা শুনে ধীরেনের মনে ভীষণ কষ্ট হতে থাকে। গর্ভবতী বোন শুভ্রার সুবিধার জন্যই ওই ডোবার ঘাটের সিঁড়িগুলি সে নিজের হাতে বানিয়ে দিয়েছিল। আর সেখানেই বোনকে মরতে হলো! এই দুঃসহ কষ্টে ধীরেন কোনো কাজেই মন বসাতে পারে না। এদিকে ধীরেন বুঝতে পারে, গ্রামের মানুষ থেকে শুরু করে সবাই যেন তাকে একটু অন্য চোখে দেখছে। পুরুতঠাকুর তাকে শাস্ত্র মেনে কাজকর্ম করতে বলেন আর বাড়ির সবার জন্য মাদুলি নেওয়ার পরামর্শ দেন। স্কুলে গিয়েও ধীরেনের মনে হয় সে যেন সেখানে একদম অচেনা কেউ। ছাত্ররাও তাকে এড়িয়ে চলে বা ফিসফিস করে কথা বলে। এরপর হেডমাস্টারমশাইও স্কুলের সেক্রেটারি মথুরবাবুর কথা মতো ধীরেনকে এক মাসের ছুটি দিয়ে দেন এবং সেদিন থেকেই পড়াতে নিষেধ করেন।
স্কুল থেকে মাইলখানেক হাঁটলেই মথুরবাবুর বাড়ি। ধীরেন একবার ভাবল ওঁর কাছে গিয়ে ছুটিটা বাতিল করার কথা বলবে। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝল, এখন প্রতিদিন ইশকুলে গিয়ে ছেলেদের পড়ানোর মতো মনের অবস্থা তার নেই। পরিচিত মানুষের সামনে দাঁড়াতেও তার খুব লজ্জা করছিল। তাই সে সোজা বাড়ি ফিরে যায় ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকার জন্য। সারা দুপুর ঘরের ভেতর ছটফট করে বিকেলে ধীরেন যখন বাইরে আসে, তখন তার বউ শান্তি বাসন মেজে ঘাট থেকে ফিরছিল। ক্ষেন্তিপিসির পরামর্শে শান্তি তখন একটা বাঁশের দু-দিক পুড়িয়ে ঘাটের রাস্তায় আড়াআড়ি ফেলে রাখার ব্যবস্থা করছিল, যাতে কোনো অশরীরী আত্মা ঘরে ঢুকতে না পারে। ভয়ে আতঙ্কে শান্তি সন্ধে হওয়ার আগেই প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। অশরীরী আত্মাদের আঁশটে গন্ধ টানে বলে বিকেলে সে কোনো মাছও রাঁধেনি। রাতের খাওয়া সেরে, ধীরেনের খাবার ঢেকে রেখে সে রান্নাঘরে তালা দিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ঢোকে।
শান্তি ধীরেনকে ঘরে ডাকলেও ধীরেন যায় না। রাত বাড়তে থাকে। ধীরেনের মনে হয়, বোন শুভ্রাকে একবার তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত। তাই সে ওই পোড়া বাঁশ টপকে ডোবার দিকে এগিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে শান্তি শুনতে পায়, একটা অদ্ভুত আর বিকট গলায় ধীরেন তাকে ডাকছে। বাইরে বেরিয়ে শান্তি দেখে, বাঁশের ওপারে দাঁড়িয়ে হিংস্র জানোয়ারের মতো গর্জন করছে ধীরেন। তার জামাকাপড়ে কাদা আর রক্ত মাখানো, ঠোঁট থেকে থুতনি বেয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। সে শান্তিকে বাঁশটা সরিয়ে নিতে বলে, কারণ কোনোভাবেই সে নাকি ওই পোড়া বাঁশ টপকাতে পারছে না। শান্তি তখন নিশ্চিত হয়ে যায় যে, ধীরেনের ঘাড়ে ভূত চেপেছে। তার তীক্ষ্ণ চিৎকারে গ্রামের সবাই আর কুঞ্জ গুনিন ছুটে আসে। ধীরেনকে স্নান করিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ঠিক দামিনীর মতোই তন্ত্রমন্ত্র শুরু হয়। এরপর কুঞ্জ গুনিন কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে ধীরেনের নাকের কাছে ধরে কড়া গলায় তার পরিচয় জানতে চায়। তখন ধীরেন চিৎকার করে বলে ওঠে যে, সে-ই আসলে বলাই চক্রবর্তী, আর সে-ই শুভ্রাকে খুন করেছে।

হলুদ পোড়া গল্পের নামকরণ :

'হলুদ পোড়া' গল্পে দেখানো হয়েছে কীভাবে মানুষের মনে কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাস শেকড় গেড়ে বসে। গ্রামে পরপর দুটো মৃত্যুর পর যখন নবীনের বউ দামিনী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যায়, তখন পঙ্কজ ঘোষালের মতো কিছু মানুষ ধরে নেয় যে তাকে ভূতে ধরেছে। ধীরেনের মতো শিক্ষিত মানুষ বাধা দিলেও শেষপর্যন্ত কুঞ্জ গুনিনকে ডাকা হয়। ভূত তাড়ানোর নামে শুরু হয় নানা যুক্তিহীন ও অমানবিক কাজ। শেষে কুঞ্জ একটা কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে দামিনীর নাকের কাছে ধরে পরিচয় জানতে চাইলে, দামিনী নিজেকে মৃত 'শুভ্রা' বলে দাবি করে।
গল্পের শুরুতে যে ধীরেন এসব কুসংস্কারের ঘোর বিরোধী ছিল, শেষে সে নিজেই মানসিক অবসাদে ভুগে রাতের অন্ধকারে মৃত শুভ্রার সঙ্গে কথা বলতে পুকুরঘাটে যায়। কিছুক্ষণ পর তার স্ত্রী শুনতে পায়, ধীরেন পশুর মতো গর্জন করছে আর তার চিবুক বেয়ে রক্ত পড়ছে। ভূত আটকাতে রাখা বাঁশ সে কিছুতেই টপকাতে পারছে না। তার স্ত্রী নিশ্চিত হয়ে যায় যে ধীরেনের ঘাড়েও ভূত চেপেছে। আবারও কুঞ্জ গুনিন আসে এবং ঠিক আগের মতোই মালসার আগুনে কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে ধীরেনের নাকের কাছে ধরে তার পরিচয় জানতে চায়। তখন ধীরেন বলে ওঠে-সে-ই বলাই চক্রবর্তী, আর সে-ই শুভ্রাকে খুন করেছে!
এভাবেই একটা অলৌকিক বা কাল্পনিক ধারণা পোড়া হলুদের সাহায্যে যেন সত্যি বলে প্রমাণ পেয়ে যায়। যে ধীরেন একদিন জ্ঞানবুদ্ধির কথা বলে গুনিন ডাকতে বারণ করেছিল, শেষে সে নিজেই কুঞ্জর মন্ত্রতন্ত্র আর কুসংস্কারের শিকার হলো। মানুষের যুক্তিবাদী মন থেকে এই অন্ধবিশ্বাসে তলিয়ে যাওয়ার পেছনে অনুঘটকের কাজ করেছে ওই 'হলুদ পোড়া'। তাই গল্পের এই নামটি একদম সার্থক।

হলুদ পোড়া গল্পের শব্দার্থ :

যোয়ান মদ্দ - তাগড়াই বা বলশালী যুবক, ভীরু মেয়ে - ভয়কাতুরে স্বভাবের মেয়ে, রিওয়ার্ড - বকশিশ বা পুরস্কার, গেঁয়ো - গ্রাম্য, চৌকাঠ - দরজার সঙ্গে লাগানো কাঠামো, খাপছাড়া - অদ্ভুত বা মানানসই নয় এমন, মুষড়ে যায় - বিমর্ষ হয়ে পড়ে, ভিটে - বাড়ি, সপরিবারে পরিপুষ্ট হয়েছিলেন - গোটা পরিবারের ভরণপোষণ সুন্দরভাবে চলেছিল, আটচির - আট টুকরো (প্রচণ্ড আঘাতে মাথা ফেটে চৌচির হওয়া বোঝাতে ব্যবহৃত), অপ্রস্তুত হয়ে রইল - হতভম্ব বা দিশেহারা হয়ে থাকা, বজ্রকণ্ঠে - মেঘের গর্জনের মতো গম্ভীর গলায়, মালসা - মাটির তৈরি চওড়া পাত্র বা বাটি, মাদুলি - মন্ত্রপূত কবচ রাখার ধাতব আধার, মজা পুকুর - সংস্কারের অভাবে কাদা ও আবর্জনায় বুজে যাওয়া পুকুর, চার-আনা - এক টাকার এক চতুর্থাংশ বা পঁচিশ পয়সা, সিকি হিসেবেও পরিচিত, দাদামশায় - ঠাকুরদা, অশরীরী শক্তি - ভূতপ্রেত বা অলৌকিক কোনো ক্ষমতা, প্যাট করে - খুব হালকাভাবে বা আলতো করে, এলো চুল - অবিন্যস্ত বা খোলা চুল, খুড়ো - কাকা, আড়ষ্ট - অবশ, মুষড়ে - হতাশায় বা মনঃকষ্টে ভেঙে পড়া, সাঁঝের বাতি - সন্ধ্যার সময় জ্বালানো প্রদীপ, ডোবা - ছোটো জলা জায়গা, আবেষ্টনী - পরিবেশ, কোঁচার খুঁট - কাপড়ের প্রান্ত, ভর সাঁঝে - ঠিক সন্ধ্যাবেলায় বা সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারে, চেতনায় ঝাঁকি - মনের ভেতর নাড়া লেগে, পুরুতঠাকুর - পুরোহিত, বিস্ফারিত - বিকশিত, নিস্পন্দন - অসাড়/অচঞ্চল, গুমরে গুমরে কাঁদা - শব্দ না করে ভেতর থেকে ডুকরে কাঁদা, দুর্লভ - যা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন বা বিরল, খটকা - সন্দেহ, গজারি গাছ - শাল গাছ (শিকড় থেকে নতুন চারা গজায় বলে এই নাম), আট -আনা - এক টাকার অর্ধেক অংশ বা পঞ্চাশ পয়সা, আধুলি হিসেবেও পরিচিত, টিটকারী - বিদ্রূপ করে বা মজা উড়িয়ে কথা বলা, হারামজাদা - বেজন্মা, বিয়োবার - সন্তান জন্ম দেওয়ার, মশানে - শ্মশান বা বধ্যভূমিতে, অদেহী - যার নির্দিষ্ট কোনো শরীর নেই, গুণী - ওঝা বা মন্ত্রতন্ত্র জানা ব্যক্তি, জমকালো - চটক দার/জাঁকজমকপূর্ণ, গেরস্থ ঘর - সাধারণ সংসারী মানুষের বাড়ি, অবিলম্বে - একটুও দেরি না করে বা দ্রুত, প্রার্থিব - জাগতিক, দাওয়ায় - বাড়ির বারান্দায় বা রোয়াকে, গর্ভনিয়ে - সন্তানসম্ভবা বা গর্ভাবস্থায়, ছোঁয়াচ - স্পর্শ, কাছারি - বিচারালয়, গুনিন - যিনি মন্ত্রশক্তির প্রয়োগ করতে পারেন, ব্যঙ্গের মত - ঠাট্টা বা বিদ্রূপ করার ভঙ্গিতে, উপভোগ্য শিহরণ - আনন্দদায়ক রোমাঞ্চ, কোঁথায় খুঁটে - ধুতির সামনের দিকের কুঁচির শেষ প্রান্ত, পেত্নী - স্ত্রী ভূত (মূল শব্দ প্রেতিনী), পরিপুষ্ট - ভালোভাবে বেড়ে ওঠা, উৎকট - উগ্র/তীব্র/দুঃসহ, বনজঙ্গলের আববু নেই - চারদিকে গাছপালার কোনো আড়াল বা আচ্ছাদন নেই, দুর্বুদ্ধি কোনো না - কোনো রকম খারাপ চিন্তা বা অন্যায় কাজ না করা, ধাধা - মনে তৈরি হওয়া সন্দেহ বা ধন্দ, মূর্ছা - সংজ্ঞা হারানো বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, আবিষ্টনীর - পরিস্থিতির, মন্ত্রমুগ্ধের মত - মন্ত্রের দ্বারা বশীভূত হয়ে থাকার মত, মধ্যস্থতা - কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা, নিঝুম - নিস্পন্দ, মোচন - দূর করা, প্রশস্ত - চওড়া, প্রাচুর্য - প্রচুর পরিমাণ বা আধিক্য, শেষ তক্ - একেবারে শেষমেশ, অভ্যাগত - নিমন্ত্রিত ব্যক্তি বা অতিথি।

❖ লেখকের শেষ কথা : আশা করছি, 'হলুদ পোড়া' গল্পের এই ব্লগ পোস্টটি পড়ে তুমি গল্পটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা অর্জন করতে পেরেছো। এরপর যদি ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য 'হলুদ পোড়া' গল্পের খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তরের প্রয়োজন হয়, তাহলে নিচে দেওয়া 'হলুদ পোড়া গল্প সম্পর্কিত ও অন্যান্য পোস্টসমূহ' পয়েন্টটি দেখো। সেখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের লিঙ্ক দেওয়া হয়েছে।

হলুদ পোড়া গল্প সম্পর্কিত ও অন্যান্য পোস্টসমূহ :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.