এই ব্লগটি সন্ধান করুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা প্রশ্ন উত্তর পর্ব ৫ | বাংলা ভাষা ও শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস Class 11

0

ভূমিকা : WBCHSE বোর্ডের একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা পরীক্ষার জন্য ‘বাংলা শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস’ অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অধ্যায় থেকে পরীক্ষায় ৫ নম্বরের মোট তিনটি বড়ো প্রশ্ন দেওয়া থাকে, যার মধ্যে যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর করতে হয়। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির কথা মাথায় রেখে আজ আমাদের এই ব্লগের পঞ্চম পর্বে ‘বাংলা শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস’ অধ্যায়ের ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা’ অংশ থেকে আরও কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর আলোচনা করা হলো। তবে তোমরা যদি চতুর্থ পর্বটি পড়ে না থাকো, তাহলে ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা প্রশ্ন উত্তর পর্ব ৪’ লিঙ্কে ক্লিক করে পড়তে পারো।

(toc)
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা প্রশ্ন উত্তর পর্ব ৫

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা প্রশ্নোত্তর [26-31] :

[প্রতিটি প্রশ্নের মান 5]

26. বাংলা উপন্যাসের ধারায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান আলোচনা করো। অথবা, ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান আলোচনা করো। [HS Model Question 24]

উত্তর : বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর হাত ধরেই বাংলা কথাসাহিত্য পূর্ণাঙ্গ শিল্পরূপ লাভ করে। তাই বাংলা উপন্যাসের বিকাশে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।
উপন্যাসের ধারায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান :
(ক) ইতিহাসনির্ভর রোমান্সধর্মী উপন্যাসের প্রবর্তন ও সাফল্য : ঐতিহাসিক ঘটনার ভিত্তিতে রোমান্টিক কাহিনি নির্মাণে তিনি বিশেষ কৃতিত্ব দেখান। ‘দুর্গেশনন্দিনী’-তে মোগল-পাঠান সংঘর্ষ, ‘রাজসিংহ’-এ ঔরঙ্গজেব ও রাজসিংহের বিরোধ এবং ‘কপালকুণ্ডলা’-য় নবকুমার ও কপালকুণ্ডলার করুণ প্রেমকাহিনি ফুটে উঠেছে। এসব রচনায় চরিত্র বিন্যাস ও ঘটনাপ্রবাহ নির্মাণে তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পায়।
(খ) সামাজিক-পারিবারিক জীবনের চিত্রণ : সমকালীন সমাজ ও দাম্পত্য জীবনের সমস্যা তিনি বাস্তবভাবে উপস্থাপন করেন। ‘বিষবৃক্ষ’-এ দাম্পত্য সংকট, ‘রজনী’-তে প্রেম ও সামাজিক বাধা এবং ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ অবৈধ সম্পর্কের ক্ষতিকর পরিণতি দেখানো হয়েছে। এই রচনাগুলিতে সমাজবাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
(গ) দেশাত্মবোধ ও তত্ত্বভিত্তিক ভাবধারা : দেশপ্রেম ও নৈতিক আদর্শ তাঁর উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। ‘আনন্দমঠ’ সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত এবং এতে ‘বন্দেমাতরম্’ স্বদেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠে। ‘দেবী চৌধুরানী’ ও ‘সীতারাম’-এ নিষ্কাম কর্ম ও ধর্মচিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়।
(ঘ) নভেলেট রচনায় অবদান : বড়ো উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি ছোটো আকারের কাহিনিও লেখেন, যা বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। ‘রাধারানী’, ‘ইন্দিরা’ ও ‘যুগলাঙ্গুরীয়’ এই রচনাগুলিতে সংক্ষিপ্ত পরিসরে কাহিনির সুষ্ঠু বিন্যাস দেখা যায়।
(ঙ) উপন্যাসের কাঠামো ও ভাষার বিকাশ : সুসংগঠিত কাহিনি, আদি-মধ্য-অন্তযুক্ত বিন্যাস, অন্তর্দ্বন্দ্বময় চরিত্র এবং সাধুভাষার সৌন্দর্যের মাধ্যমে তিনি বাংলা উপন্যাসকে দৃঢ় ভিত্তি দেন।
উপসংহার : অতএব, বাংলা উপন্যাসের ভিত্তি নির্মাণে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান অনস্বীকার্য। ইতিহাস, সমাজ, দেশপ্রেম ও মানবচরিত্র এই সব বিষয়কে একত্র করে তিনি বাংলা উপন্যাসকে সমৃদ্ধ ও সুসংগঠিত রূপ দেন। তাই তিনি বাংলা উপন্যাসের প্রধান নির্মাতা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।

27. বাংলা ছোটোগল্পে রবীন্দ্রনাথের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর : বাংলা ছোটোগল্পের বিকাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা সর্বাগ্রে স্মরণীয়। কথাসাহিত্যের এই সংক্ষিপ্ত শাখাটি তাঁর হাতে সুগঠিত রূপ পায়। অল্প কথায় গভীর অনুভূতি প্রকাশের যে বৈশিষ্ট্য ছোটোগল্পের, তা তিনি সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭৭ সালে ‘ভিখারিণী’ রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর ছোটোগল্পের সূচনা ঘটে এবং পরবর্তীকালে তিনশোরও বেশি গল্প তিনি রচনা করেন, যা বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।
বাংলা ছোটোগল্পে রবীন্দ্রনাথের অবদান :
(ক) ছোটোগল্প ধারার প্রতিষ্ঠা ও প্রসার : রবীন্দ্রনাথ ছোটো পরিসরে সংহত কাহিনি নির্মাণের মাধ্যমে এই ধারাকে সুসংগঠিত করেন। তাঁর ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘লিপিকা’, ‘তিন সঙ্গী’ প্রভৃতি সংকলনে অসংখ্য গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
(খ) সমাজ ও সমাজসমস্যার চিত্রায়ণ : তিনি সমাজের নানা স্তরের মানুষের জীবন তুলে ধরেছেন। জমিদার থেকে প্রান্তিক চরিত্র সবাই তাঁর গল্পে স্থান পেয়েছে। যেমন -‘কাবুলিওয়ালা’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘দেনাপাওনা’, ‘মাস্টারমশাই’ প্রভৃতি গল্পে সামাজিক বাস্তবতা ফুটে উঠেছে।
(গ) প্রেম ও মানবসম্পর্কের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ : রবীন্দ্রনাথ প্রেমের বিভিন্ন রূপ ও মানসিক টানাপোড়েনকে গভীরভাবে উপস্থাপন করেছেন। যেমন - ‘নষ্টনীড়’, ‘মানভঞ্জন’, ‘একরাত্রি’, ‘শাস্তি’ ইত্যাদি গল্পে মানবমনের জটিলতা ফুটে উঠেছে।
(ঘ) প্রকৃতি ও মানুষের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক : রবীন্দ্রনাথের গল্পে প্রকৃতি মানুষের মনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চরিত্রের সুখ-দুঃখ ও একাকিত্বের প্রতিফলন প্রকৃতির মধ্যে দেখা যায়। যেমন - ‘বলাই’, ‘সুভা’, ‘আপদ’ গল্পে রয়েছে।
(ঙ) রহস্য ও অতিপ্রাকৃত ভাবের ব্যবহার : কিছু গল্পে তিনি রহস্যময় ও অলৌকিক আবহ সৃষ্টি করেছেন, যা কাহিনিকে বিশেষ আকর্ষণ দেয়। যেমন : ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ও ‘মণিহারা’ গল্পে রহস্যের উপস্থিতি স্পষ্ট। আর ‘গুপ্তধন’ ও ‘কঙ্কাল’ গল্পে অস্বাভাবিক ঘটনার মাধ্যমে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
উপসংহার : সুতরাং বলা যায়, কাহিনি বিন্যাস, চরিত্রচিত্রণ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ছোটোগল্পকে উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন। বাংলা ছোটোগল্পের প্রকৃত পথিকৃৎ হিসেবে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।

28. বাংলার উপন্যাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান আলোচনা করো। [HS Model Question 24]

উত্তর : বাংলা উপন্যাসের ধারায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক। রবীন্দ্রনাথের সময়েই তাঁর আবির্ভাব ঘটে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পাঠকমহলে বিশেষ স্থান অর্জন করেন। ছোটো-বড়ো মিলিয়ে তিনি প্রায় ত্রিশটি উপন্যাস রচনা করেন। ‘বড়দিদি’ ছিল তাঁর প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত উপন্যাস। সাধারণ মানুষের সহজ জীবনকথা তাঁর রচনার প্রধান বিষয়।
বাংলা উপন্যাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান :
(ক) পারিবারিক জীবনের দ্বন্দ্ব ও সম্পর্কচিত্র : শরৎচন্দ্র পরিচিত পরিবারে ঘটে চলা মান-অভিমান, কলহ ও সম্পর্কের জটিলতা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। যেমন - ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘বৈকুণ্ঠের উইল’, ‘মেজদিদি’, ‘পণ্ডিতমশায়’ প্রভৃতি উপন্যাসে পারিবারিক টানাপোড়েন বাস্তব রূপে ফুটে উঠেছে।
(খ) সমাজ সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি : সমাজের ভেতরের অন্যায় ও বৈষম্য তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। দুর্বল মানুষের প্রতি অত্যাচার তাঁর রচনায় বিশেষভাবে চিত্রিত। যেমন - ‘পল্লীসমাজ’, ‘অরক্ষণীয়া’, ‘বামুনের মেয়ে’ উপন্যাসে সামাজিক অসংগতি প্রকাশ পেয়েছে।
(গ) প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের কাহিনি : প্রেমের জটিলতা, সামাজিক বাধা এবং দাম্পত্য জীবনের সুখ-দুঃখ তিনি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। যেমন - ‘দেবদাস’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসে প্রেম ও সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে।
(ঘ) মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ : চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মানসিক টানাপোড়েন তাঁর উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। যেমন - ‘গৃহদাহ’ ও ‘চরিত্রহীন’-এ মানসিক জটিলতা স্পষ্টভাবে প্রকাশিত।
(ঙ) রাজনৈতিক ও আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস : শরৎচন্দ্র তাঁর কিছু উপন্যাসে সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাকে স্থান দিয়েছেন। যেমন - ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে পরাধীন ভারতের ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর প্রকাশিত হয়েছে। আবার ‘শ্রীকান্ত’ চার পর্বে রচিত একটি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, যেখানে লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ছাপ লক্ষ্য করা যায়।
উপসংহার : সুতরাং সমাজবাস্তবতা, মানবমনের গভীরতা ও সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরে শরৎচন্দ্র বাংলা উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। এই কারণেই তিনি বাংলা সাহিত্যে অমর কথাশিল্পী হিসেবে স্বীকৃত।

29. বাংলা উপন্যাসের ধারায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব বিচার করো।

উত্তর : বাংলা উপন্যাসে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এক অনন্য নাম। তিনি মূলত গ্রামবাংলার অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষের জীবনকে হৃদয়ের মমতা দিয়ে তুলে ধরেছেন। ১৯২৯ সালে ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা ঘটে। এরপর একাধিক উপন্যাস রচনা করে তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন।
বাংলা উপন্যাসের ধারায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব :
(ক) গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র অঙ্কন : বিভূতিভূষণ পল্লির সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। যেমন -‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে অপু ও দুর্গার মাধ্যমে দরিদ্র গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও আনন্দ ফুটে উঠেছে।
(খ) মানবজীবনের বিকাশ ও অন্তর্গত অনুভূতি : চরিত্রের বেড়ে ওঠা ও মানসিক পরিবর্তন তিনি গভীরভাবে দেখিয়েছেন। যেমন -‘অপরাজিত’-এ অপুর শৈশব থেকে পরিণত জীবনের অভিজ্ঞতা ও তার অন্তর্মুখী স্বভাবের বিকাশ বর্ণিত হয়েছে।
(গ) প্রকৃতিচেতনা ও সৌন্দর্যবোধ : তাঁর উপন্যাসে প্রকৃতি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক পরিবেশ কাহিনির সঙ্গে মিশে যায়। যেমন -‘আরণ্যক’-এ অরণ্যের রূপমাধুর্য বিস্তৃতভাবে চিত্রিত হয়েছে। ‘দেবযান’ ও ‘ইছামতী’-তেও প্রকৃতির সঙ্গে গভীর অনুভূতির যোগ দেখা যায়।
(ঘ) আধ্যাত্মিক ও ভাবগম্ভীর দৃষ্টিভঙ্গি : প্রকৃতির বর্ণনার সঙ্গে অনেক সময় আধ্যাত্মিক অনুভূতিও যুক্ত হয়েছে। যেমন -‘দেবযান’ ও ‘দৃষ্টি-প্রদীপ’-এ এই ভাবপ্রবণতা স্পষ্ট।
(ঙ) ভিন্নধর্মী বিষয় নির্বাচন : তিনি কেবল গ্রামীণ জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; সমাজ ও অর্থনৈতিক সমস্যাও তুলে ধরেছেন। যেমন -‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এ নাগরিক জীবন ও ব্যবসাবুদ্ধির চিত্র আছে, আর ‘অশনি সংকেত’-এ দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক সংকটের বাস্তব ছবি প্রকাশ পেয়েছে।
উপসংহার : অতএব, গ্রামজীবনের সহজ ছবি, প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং মানুষের অন্তর্জীবনের সূক্ষ্ম প্রকাশের মাধ্যমে বিভূতিভূষণ বাংলা উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর রচনাশৈলী ও বিষয়বৈচিত্র্য তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন এনে দিয়েছে।

30. বাংলা ছোটোগল্পের ধারায় প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর : বাংলা ছোটোগল্পের ইতিহাসে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের যুগেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না এবং সমাজের বাস্তব চিত্র তিনি সহজ ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে কৌতুকরস ও মানবতাবোধ তাঁর গল্পের প্রধান শক্তি।
ছোটোগল্পের ধারায় প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের অবদান :
(ক) উদার মানবতাবোধের প্রকাশ : মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি তাঁর গল্পে বারবার প্রকাশ পেয়েছে। যেমন -‘কাশিবাসিনী’ গল্পে এক বিধবা নারীর দুঃখের সঙ্গে মাতৃস্নেহের আবেগও সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে।
(খ) নির্মল হাস্যরসের প্রয়োগ : প্রভাতকুমার বাংলা ছোটোগল্পে বিশুদ্ধ কৌতুকরস প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর গল্পে স্বাভাবিক হাস্যরস পাঠককে আনন্দ দেয়। যেমন -‘বলবান জামাতা’ ও ‘বিবাহের বিজ্ঞাপন’ গল্পে হাস্যরসের উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
(গ) সমাজসমস্যা ও কুসংস্কারের চিত্র : সমাজের নানা অসংগতি, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংস্কারের সমালোচনা তাঁর রচনায় পাওয়া যায়। যেমন -‘ধর্মের কল’, ‘স্বর্ণসিংহ’, ‘প্রতিজ্ঞাপূরণ’, ‘বাস্তুসাপ’ গল্পে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ফুটে উঠেছে।
(ঘ) মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্কচিত্র : তিনি মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্কও গভীরভাবে দেখিয়েছেন। যেমন -‘আদরিণী’ গল্পে একটি হাতিকে কেন্দ্র করে মানবিক সম্পর্কের আবেগময় দিক তুলে ধরা হয়েছে।
(ঙ) সমকালীন সমাজ ও জাতীয় ভাবনার প্রতিফলন : সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশও তাঁর গল্পে স্থান পেয়েছে। যেমন -‘দেশী ও বিলাতী’ ও ‘উকিলের বুদ্ধি’ গল্পে স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমি লক্ষ্য করা যায়।
উপসংহার : অতএব, মানবতাবোধ, কৌতুকরস, সমাজসমালোচনা ও চরিত্রচিত্রণের দক্ষতার মাধ্যমে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বাংলা ছোটোগল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাই তিনি রবীন্দ্র-সমকালেও একজন জনপ্রিয় ও উল্লেখযোগ্য গল্পকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

31. ছোটোগল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের কৃতিত্ব আলোচনা করো।

উত্তর : কল্লোল যুগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র ছোটোগল্প রচনাতেই বেশি সাফল্য অর্জন করেন। ১৯২৪ সাল থেকে তিনি গল্প লেখা শুরু করেন। তাঁর প্রথম গল্প ‘শুধু কেরানী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন গল্পগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি বাংলা ছোটোগল্পে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলেন।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের কৃতিত্ব :
(ক) সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্টের চিত্রণ : তিনি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের সংগ্রামী জীবনকে বাস্তবভাবে তুলে ধরেছেন। যেমন -‘শুধু কেরানী’ গল্পে কেরানির জীবনের হতাশা ও যন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে। ‘চুরি’ গল্পে শিক্ষক জীবনের কষ্ট ফুটে উঠেছে।
(খ) দারিদ্র্য ও নৈতিক সংকটের উপস্থাপন : অভাব কীভাবে মানুষের নীতি ও আদর্শকে দুর্বল করে, তা তাঁর গল্পে স্পষ্ট। যেমন -‘সংসার সীমান্তে’ ও ‘মহানগর’-এ দারিদ্র্যের চাপে মানুষের বিপর্যস্ত অবস্থার ছবি পাওয়া যায়।
(গ) মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দক্ষতা : মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মানসিক টানাপোড়েন তাঁর গল্পের গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেমন -‘শৃঙ্খল’, ‘স্টোভ’, ‘ভূমিকম্প’ গল্পে মনোবিকলন ও জীবনের সংকট সূক্ষ্মভাবে চিত্রিত।
(ঘ) হতাশা ও নৈরাশ্যের আবহ : তাঁর গল্পে জীবনের অস্থিরতা ও আত্মপ্রবঞ্চনার অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে। যেমন -‘পুন্নাম’-এ বাৎসল্যের আড়ালে নৈরাশ্য দেখা যায়, আর ‘হয়তো’ ও ‘বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে’-তে অসহায় জীবনের কথা বলা হয়েছে।
(ঙ) রোমান্টিক ও রহস্যময় উপস্থাপনা : বাস্তবতার সঙ্গে রোমান্টিক ভাব ও রহস্যের মিশ্রণও তাঁর গল্পে রয়েছে। যেমন -‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পে মনস্তাত্ত্বিক রহস্য ও কল্পনার সার্থক সমন্বয় দেখা যায়।
উপসংহার : সুতরাং মানবমনের জটিলতা, দারিদ্র্যের আঘাত এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে প্রেমেন্দ্র মিত্র বাংলা ছোটোগল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন। অভিনব কাহিনির উপস্থাপনার জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছেন।

❖ লেখকের শেষ কথা : একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই পোস্টে দেওয়া ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তরগুলি মনোযোগ সহকারে পড়ে নাও। এরপর তোমরা যদি বাংলা বিষয়ের অন্যান্য পোস্টগুলি পড়তে চাও, তাহলে নিচে দেওয়া ‘বাংলা বিষয়ের অন্যান্য পোস্টসমূহ’ অংশটি দেখো।

বাংলা বিষয়ের অন্যান্য পোস্টসমূহ :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.